ক্রীড়া ডেস্ক
বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে জাপানের বিপক্ষে নাটকীয় প্রত্যাবর্তনের পর আত্মবিশ্বাসে ভরপুর ব্রাজিল শিবির। প্রথমার্ধে এক গোল পিছিয়ে থেকেও শেষ পর্যন্ত ২-১ ব্যবধানে জয় তুলে নিয়ে কোয়ার্টার ফাইনালে জায়গা নিশ্চিত করেছে পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়নরা। ম্যাচ শেষে ব্রাজিলের প্রধান কোচ কার্লো আনচেলত্তি জানিয়েছেন, দল কখনোই বিশ্বাস হারায়নি। বরং বিরতির সময় থেকেই তার দৃঢ় বিশ্বাস ছিল, সুযোগ তৈরি হলে ব্রাজিল ঘুরে দাঁড়াবেই।
ম্যাচের শুরুতে জাপান দারুণ সংগঠিত ফুটবল খেলেছে। দ্রুত প্রেসিং, শৃঙ্খলাবদ্ধ রক্ষণ এবং মাঝমাঠে নিয়ন্ত্রণ ধরে রেখে তারা ব্রাজিলকে ছন্দে ফিরতে দেয়নি। সেই চাপেরই ফল হিসেবে প্রথমার্ধে কাইশু সানোর গোলে এগিয়ে যায় এশিয়ার প্রতিনিধিরা। গোল হজমের পর ব্রাজিলের খেলায় ছিল অস্থিরতা, ভুল পাস এবং আক্রমণে ধারহীনতা। এক পর্যায়ে মনে হচ্ছিল, বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে ইতিহাসের অন্যতম বড় অঘটনের শিকার হতে যাচ্ছে সেলেসাওরা।
তবে দ্বিতীয়ার্ধে চেনা রূপে ফিরে আসে ব্রাজিল। কৌশলগত পরিবর্তন এনে আক্রমণের ধরন পাল্টে দেন আনচেলত্তি। মাঝমাঠে ছোট পাসের বদলে দুই প্রান্ত ব্যবহার করে বক্সে ধারাবাহিক ক্রস তোলার নির্দেশ দেন তিনি। সেই পরিকল্পনাই ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। প্রথমে ক্যাসেমিরো সমতা ফেরান, এরপর অতিরিক্ত সময়ে বদলি হিসেবে নামা গ্যাব্রিয়েল মার্তিনেল্লি দুর্দান্ত ফিনিশিংয়ে জয়সূচক গোল করে ব্রাজিলকে শেষ আটে তুলে নেন।
ম্যাচ শেষে আনচেলত্তি বলেন, বিরতির সময় তিনি খেলোয়াড়দের শুধু ধৈর্য ধরে নিজেদের পরিকল্পনায় অটল থাকতে বলেছেন। তার ভাষায়, দলের খেলোয়াড়রা জানত যে সুযোগ তৈরি হবে, আর সেই সুযোগ কাজে লাগাতে পারলেই ম্যাচ তাদের দিকেই ঝুঁকবে। তিনি মনে করেন, এই জয় শুধু একটি ম্যাচ জেতা নয়, বরং দল হিসেবে ব্রাজিলের মানসিক দৃঢ়তারও প্রমাণ।
ইতালিয়ান এই কোচ আরও জানান, ম্যাচের শুরুতে জাপানের ঘন রক্ষণ ভাঙতে গিয়ে তার দল সমস্যায় পড়েছিল। তাই দ্বিতীয়ার্ধে আক্রমণের কৌশলে পরিবর্তন এনে উইং ব্যবহার এবং বক্সে বেশি বল পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। তার মতে, ম্যাচের পরিস্থিতি বুঝে দ্রুত কৌশল বদলে নেওয়ার সামর্থ্যই বড় দলের অন্যতম বৈশিষ্ট্য, আর সেদিক থেকে তার দল ইতিবাচক অগ্রগতি দেখিয়েছে।
আনচেলত্তি আরও একটি চমকপ্রদ তথ্য প্রকাশ করেন। তিনি জানান, নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে ব্রাজিল সমতায় ফিরতে না পারলে নেইমারকে মাঠে নামানোর প্রস্তুতি ছিল। তবে দল সমতা ফেরানোয় শেষ পর্যন্ত সেই পরিকল্পনা বাস্তবায়নের প্রয়োজন হয়নি। ফলে ইনজুরি কাটিয়ে ফেরা এই তারকা এখনো বিশ্বকাপে সীমিত সময়ই খেলেছেন।
পরিসংখ্যানও ব্রাজিলের এই জয়কে বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে। ২০০২ সালে ইংল্যান্ডকে হারানোর পর এবারই প্রথম বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে পিছিয়ে থেকেও জয় তুলে নিল সেলেসাওরা। একই সঙ্গে এটি কার্লো আনচেলত্তির অধীনে দলের সবচেয়ে পরিপূর্ণ পারফরম্যান্স বলেও মন্তব্য করেন তিনি। তার মতে, ফুটবলে কঠিন মুহূর্ত আসবেই, কিন্তু সেই চাপ সামলে ঘুরে দাঁড়ানোর মানসিকতাই বড় দলকে আলাদা করে।
অন্যদিকে পরাজয় সত্ত্বেও হতাশ নন জাপানের প্রধান কোচ হাজিমে মোরিয়াসু। তার বিশ্বাস, বিশ্বের সেরাদের সঙ্গে জাপানের ব্যবধান আগের চেয়ে অনেকটাই কমেছে। ম্যাচের দীর্ঘ সময় তার দল বলের নিয়ন্ত্রণ ধরে রেখেছে এবং রক্ষণেও ছিল শৃঙ্খলাবদ্ধ। তবে ব্রাজিল, আর্জেন্টিনা কিংবা ফ্রান্সের মতো পরাশক্তিকে নিয়মিত হারাতে হলে আরও ধারাবাহিকতা ও অভিজ্ঞতার প্রয়োজন বলে মনে করেন তিনি।
কোয়ার্টার ফাইনালে ওঠার পর ব্রাজিলের আত্মবিশ্বাস আরও বেড়েছে। আনচেলত্তির বিশ্বাস, প্রতিটি ম্যাচের সঙ্গে তার দল আরও পরিণত হচ্ছে। আর এই ধারাবাহিক উন্নতি ধরে রাখতে পারলে ষষ্ঠ বিশ্বকাপ শিরোপার স্বপ্ন বাস্তবে রূপ নেওয়াও অসম্ভব নয়।
Leave a Reply