ক্রীড়া ডেস্ক
ফিফা বিশ্বকাপ ২০২৬-এর নকআউট পর্ব শুরু হতেই ফুটবল মাঠে তৈরি হয়েছে উত্তেজনার নতুন ঝড়। প্রতিটি ম্যাচ এখন যেন একেকটি ‘নকআউট পরীক্ষা’—একটি ভুল সিদ্ধান্তেই শেষ হয়ে যেতে পারে বছরের পর বছর ধরে গড়ে তোলা স্বপ্ন। কেউ বিদায় নিচ্ছেন ব্যর্থতার আক্ষেপ নিয়ে, আবার কেউ হয়ে উঠছেন নতুন ইতিহাসের নায়ক।
গ্রুপ পর্বেই আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছেন আর্জেন্টিনার অধিনায়ক লিওনেল মেসি। ৩ ম্যাচে ৬ গোল করে তিনি শুধু দলকে এগিয়ে নেননি, বরং বিশ্বকাপের ইতিহাসে সর্বোচ্চ ১৯ গোলের রেকর্ড গড়েও নিজের কিংবদন্তি মর্যাদা আরও উঁচুতে নিয়ে গেছেন। বয়স ৩৯ হলেও তার পারফরম্যান্সে নেই কোনো কমতি—বরং অভিজ্ঞতা আর দক্ষতার মিশেলে তিনি এখনো সমান ভয়ংকর।
এই আসরে আরও আলোচনায় আছেন ফ্রান্সের কিলিয়ান এমবাপ্পে, ব্রাজিলের ভিনিসিয়ুস জুনিয়র এবং নরওয়ের আর্লিং হালান্ড—তিনজনই ৪ গোল করে নিজেদের প্রতিভার ঝলক দেখিয়েছেন। তবে পরিসংখ্যান বলছে, অভিজ্ঞতার সঙ্গে লড়াইয়ে এখনও এগিয়ে মেসিই।
তবে এবার ফিফা চালু করেছে নতুন পারফরম্যান্স বিশ্লেষণ পদ্ধতি—‘পাওয়ার র্যাঙ্কিং’। এই আধুনিক মডেলে খেলোয়াড়দের শুধু গোল নয়, বরং আক্রমণ, সুযোগ সৃষ্টি ও রক্ষণ—এই তিন দিকের সামগ্রিক দক্ষতা মূল্যায়ন করা হচ্ছে।
সবচেয়ে চমকপ্রদ বিষয় হলো, গ্রুপ পর্ব শেষে প্রকাশিত এই র্যাঙ্কিংয়ে গোলদাতাদের শীর্ষে থাকা সত্ত্বেও প্রথম স্থান দখল করতে পারেননি মেসি বা এমবাপ্পে। বরং সবার উপরে উঠে এসেছেন জার্মানির আক্রমণভাগের খেলোয়াড় দেনিজ উন্দাভ। ক্লাব ফুটবলে ধারাবাহিক পারফরম্যান্স এবং বিশ্বকাপে কার্যকর অবদান মিলিয়ে তিনি পেয়েছেন সর্বোচ্চ সামগ্রিক স্কোর।
উন্দাভের পরেই দ্বিতীয় অবস্থানে আছেন লিওনেল মেসি। আক্রমণ, প্লেমেকিং এবং অভিজ্ঞতার সমন্বয়ে তিনি পেয়েছেন প্রায় সর্বোচ্চ মানের রেটিং। তালিকায় তৃতীয় স্থানে রয়েছেন কিলিয়ান এমবাপ্পে এবং চতুর্থ স্থানে ভিনিসিয়ুস জুনিয়র।
অন্যদিকে পর্তুগালের তারকা ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো এই র্যাঙ্কিংয়ে তুলনামূলকভাবে পিছিয়ে পড়েছেন। ৭৯তম অবস্থানে থাকা এই কিংবদন্তির স্কোরিং প্রভাব এবার আগের মতো ধারালো না হলেও, অভিজ্ঞতা ও নেতৃত্ব নিয়ে তিনি এখনো দলে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছেন।
জার্মানির দেনিজ উন্দাভের উত্থান এবারের আসরের অন্যতম আলোচ্য ঘটনা। শরণার্থী পরিবার থেকে উঠে আসা এই ফুটবলার মাঠে যেমন পারফর্ম করছেন, তেমনি মাঠের বাইরেও তৈরি করছেন এক অনুপ্রেরণামূলক গল্প। ইয়াজিদি ও কুর্দি বংশোদ্ভূত এই খেলোয়াড়ের শৈশব কেটেছে যুদ্ধ, বাস্তুচ্যুতি আর অনিশ্চয়তার মধ্যে।
বিশ্বকাপে এখন পর্যন্ত বদলি হিসেবে নেমে ৩ গোল ও ২ অ্যাসিস্ট করে তিনি দলকে এগিয়ে নিতে বড় ভূমিকা রেখেছেন। যদিও জার্মানি পরবর্তী পর্বে টিকে থাকতে পারেনি, তবুও তার ব্যক্তিগত পারফরম্যান্স হয়ে উঠেছে টুর্নামেন্টের অন্যতম আলোচিত বিষয়।
উন্দাভ নিজেই এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, তার এই অর্জন শুধু ব্যক্তিগত নয়—এটি একটি পুরো সম্প্রদায়ের অনুপ্রেরণা। তার মতে, বিশ্বমঞ্চে নিজের উপস্থিতি প্রমাণ করে দিয়েছে যে সুযোগ পেলে যে কেউ সীমাবদ্ধতাকে অতিক্রম করতে পারে।
ইউরোপ ও মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন ইয়াজিদি অধ্যুষিত এলাকায় উন্দাভের খেলা দেখা এখন এক ধরনের আবেগের উৎসবে পরিণত হয়েছে। অনেকেই মনে করছেন, তিনি শুধু একজন ফুটবলার নন—বরং একটি সংগ্রামী জনগোষ্ঠীর প্রতীক।
সব মিলিয়ে এবারের বিশ্বকাপ শুধু গোল বা ট্রফির লড়াই নয়, বরং পরিসংখ্যান, পারফরম্যান্স এবং মানবিক গল্পের এক অসাধারণ মিশ্রণ হয়ে উঠেছে। যেখানে মেসি-এমবাপ্পেদের মতো তারকারা ইতিহাস লিখছেন, আর উন্দাভের মতো নতুন মুখরা লিখছেন অনুপ্রেরণার নতুন অধ্যায়।
Leave a Reply