ক্রীড়া ডেস্ক
ফাইনালের বাঁশি বাজার আগেই টেলিভিশন ক্যামেরা ঘুরে যায় গ্যালারিতে। মায়ের কোলে মুখ লুকিয়ে অঝোরে কাঁদছে এক ছোট্ট ফরাসি সমর্থক। সেই দৃশ্য যেন ম্যাচের পুরো গল্পটাই বলে দিচ্ছিল। ধারাভাষ্যকারের কণ্ঠে তখন একটাই মন্তব্য— ‘আজ ফ্রান্সকে পুরোপুরি ছাপিয়ে গেছে স্পেন।’
বিশ্বকাপ শুরুর আগে অপ্টার সুপার কম্পিউটার, সাবেক ফুটবলার, বিশ্লেষক—অনেকেই ফ্রান্সকে শিরোপার সবচেয়ে বড় দাবিদার হিসেবে দেখেছিলেন। তারকাখচিত স্কোয়াড, অভিজ্ঞতা আর ধারাবাহিক পারফরম্যান্সের কারণে ডিডিয়ের দেশমের দলকে ঘিরে ছিল আকাশছোঁয়া প্রত্যাশা। কিন্তু ফুটবল যে কাগজে-কলমে নয়, মাঠেই তার আসল বিচার হয়—সেটাই আবারও প্রমাণ করল স্পেন।
সেমিফাইনালে দুর্দান্ত নিয়ন্ত্রিত ফুটবল খেলে ২-০ গোলে ফ্রান্সকে হারিয়ে বিশ্বকাপের ফাইনালে জায়গা নিশ্চিত করেছে লা রোজা। প্রথমার্ধে পেনাল্টি থেকে মিকেল ওইয়ারজাবাল দলকে এগিয়ে দেন। এরপর দ্বিতীয়ার্ধে পেদ্রো পোরোর দারুণ এক গোলে জয় নিশ্চিত হয় স্প্যানিশদের। পুরো ম্যাচে বলের দখল, পাসিং, প্রেসিং এবং রক্ষণ—সব বিভাগেই প্রতিপক্ষকে ছাড়িয়ে যায় স্পেন।
আগামী রবিবার নিউ জার্সির মেটলাইফ স্টেডিয়ামে বিশ্বকাপের ফাইনালে স্পেনের প্রতিপক্ষ হবে ইংল্যান্ড অথবা আর্জেন্টিনা। ২০১০ সালে দক্ষিণ আফ্রিকায় প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপ জয়ের পর এবার দ্বিতীয় শিরোপার স্বপ্ন দেখছে স্প্যানিশরা।
ফ্রান্সের আক্রমণভাগে ছিলেন কিলিয়ান এমবাপ্পে, উসমান দেম্বেলে ও মাইকেল ওলিসের মতো তারকা। আগের ম্যাচগুলোতে যাদের গতিময় ফুটবলে বিপর্যস্ত হয়েছিল প্রতিপক্ষের রক্ষণ, সেই ত্রয়ীকে এদিন কার্যত নিষ্ক্রিয় করে রাখে স্পেনের ডিফেন্স। এমবাপ্পেকে একাধিকবার ডাবল মার্কিংয়ে আটকে রাখা হয়, আর মাঝমাঠে রদ্রি ও তার সতীর্থদের নিয়ন্ত্রণে ফ্রান্স খুব কমই স্বাভাবিক ছন্দে খেলতে পেরেছে।
এই ম্যাচে জিততে পারলে জার্মানি (১৯৮২, ১৯৮৬ ও ১৯৯০) এবং ব্রাজিলের (১৯৯৪, ১৯৯৮ ও ২০০২) পর তৃতীয় দল হিসেবে টানা তিনটি বিশ্বকাপ ফাইনালে ওঠার বিরল কীর্তি গড়ত ফ্রান্স। কিন্তু সেই স্বপ্ন ভেঙে দিয়ে স্পেন নিজেরাই লিখেছে নতুন ইতিহাস।
এই জয়ের মাধ্যমে টানা ৩৭ ম্যাচ অপরাজিত থেকে আন্তর্জাতিক ফুটবলে ইতালির বিশ্বরেকর্ড স্পর্শ করেছে স্পেন। ইতালি ২০১৮ থেকে ২০২১ সালের মধ্যে এই কীর্তি গড়েছিল, আর এবার সেই রেকর্ডে নাম লিখিয়েছে লুইস দে লা ফুয়েন্তের দল। স্পেনের এই অপরাজিত যাত্রায় রয়েছে ইউরো চ্যাম্পিয়নশিপের শিরোপা, বিশ্বকাপ বাছাইপর্বে দুর্দান্ত পারফরম্যান্স এবং এখন বিশ্বকাপের ফাইনালে জায়গা করে নেওয়ার গৌরব।
শুধু ফল নয়, স্পেন যেভাবে আধুনিক, দ্রুতগতির এবং দলগত ফুটবল খেলছে, তাতে অনেকের চোখেই তারা এখন শিরোপার সবচেয়ে বড় দাবিদার। তরুণ ও অভিজ্ঞ ফুটবলারের নিখুঁত সমন্বয়ে গড়া এই দলটি দেখিয়ে দিয়েছে—তারকার চেয়ে দলই শেষ পর্যন্ত সবচেয়ে বড় শক্তি।
এখন স্পেনের সামনে আর মাত্র একটি বাধা। সেই বাধা পেরোতে পারলেই ১৬ বছর পর আবারও বিশ্ব ফুটবলের সিংহাসনে বসবে লা রোজা।
Leave a Reply