আন্তর্জাতিক ডেস্ক
দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনীতিতে আবারও আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছে তিস্তা নদীর ব্যবস্থাপনা ও পুনরুদ্ধার প্রকল্প। সম্প্রতি চীনের প্রকাশ্য আগ্রহ ও সহযোগিতার ঘোষণা এই প্রকল্পকে কেবল একটি পানি ব্যবস্থাপনা উদ্যোগের গণ্ডি থেকে বের করে আঞ্চলিক কূটনীতির গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে পরিণত করেছে।
চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র গুও জিয়াকুন বেইজিংয়ে এক নিয়মিত ব্রিফিংয়ে জানান, তিস্তা নদী প্রকল্প বাংলাদেশের জনগণের জীবনমান উন্নয়ন ও দীর্ঘমেয়াদি জলসম্পদ ব্যবস্থাপনার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। তাই এই উদ্যোগে সহযোগিতা দিতে বেইজিং প্রস্তুত এবং ভবিষ্যতেও তারা প্রযুক্তিগত ও অবকাঠামোগত সহায়তা অব্যাহত রাখতে আগ্রহী। একই সঙ্গে তিনি জোর দিয়ে বলেন, এই ধরনের সহযোগিতা কোনো তৃতীয় পক্ষকে লক্ষ্য করে নয় এবং এটিকে প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক দৃষ্টিতে দেখা উচিত নয়।
এই অবস্থান এমন সময় সামনে এলো, যখন তিস্তা অববাহিকাকে ঘিরে দক্ষিণ এশিয়ার কৌশলগত অঙ্গনে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। বিশেষ করে বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চল ঘেঁষে থাকা এই নদী অঞ্চলের ভৌগোলিক গুরুত্ব এবং শিলিগুড়ি করিডরের নিকটবর্তী অবস্থান ভারতীয় নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। এই করিডর ভারতের মূল ভূখণ্ডকে উত্তর-পূর্বাঞ্চলের রাজ্যগুলোর সঙ্গে সংযুক্ত রাখার একমাত্র সংকীর্ণ স্থলপথ হওয়ায়, এর আশেপাশে বড় কোনো অবকাঠামো বা বিদেশি সম্পৃক্ততা সবসময়ই সংবেদনশীল হিসেবে বিবেচিত হয়।
ভারতের কৌশলগত মহলে অনেকে মনে করছেন, তিস্তা প্রকল্পটি শুধুমাত্র নদী শাসন বা বন্যা নিয়ন্ত্রণের বিষয় নয়, বরং এর সঙ্গে আঞ্চলিক প্রভাব ও দীর্ঘমেয়াদি ভূরাজনৈতিক সমীকরণও জড়িত। যদিও এখন পর্যন্ত দিল্লির পক্ষ থেকে এ বিষয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া আসেনি, তবে পর্যবেক্ষকদের মতে বিষয়টি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে।
অন্যদিকে বাংলাদেশের দিক থেকে দেখা গেলে, দীর্ঘদিন ধরেই তিস্তা নদীর পানিবণ্টন ও ব্যবস্থাপনা একটি গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় ইস্যু হিসেবে বিবেচিত। বিভিন্ন সময়ে এই প্রকল্প নিয়ে আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে। অতীতে ভারতের সম্পৃক্ততার বিষয়েও একাধিক দফায় কথাবার্তা সামনে এলেও বাস্তব অগ্রগতি সীমিত ছিল বলে বিশ্লেষকদের ধারণা।
চলতি বছরের শুরুতে বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড এবং চীনের একটি রাষ্ট্রায়ত্ত অবকাঠামো সংস্থার মধ্যে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের পর প্রকল্প বাস্তবায়নের আলোচনা আরও গতি পায়। এরপর থেকেই ধারণা করা হচ্ছে, প্রকল্পটি ধাপে ধাপে নকশা ও বাস্তবায়নের দিকে এগোচ্ছে, যা আঞ্চলিক শক্তিগুলোর নজর আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।
চীনের সাম্প্রতিক মন্তব্যে “তৃতীয় পক্ষ” প্রসঙ্গটি বিশেষভাবে গুরুত্ব পাচ্ছে কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের কাছে। তাদের মতে, বেইজিং এখানে স্পষ্টভাবে বোঝাতে চাইছে যে বাংলাদেশ-চীন সহযোগিতা দ্বিপাক্ষিক উন্নয়নের কাঠামোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ এবং এটিকে কোনো কৌশলগত প্রতিযোগিতার অংশ হিসেবে ব্যাখ্যা করা উচিত নয়।
সব মিলিয়ে তিস্তা প্রকল্প এখন আর কেবল একটি পানি ব্যবস্থাপনা উদ্যোগ নয়। এটি ধীরে ধীরে বাংলাদেশ, ভারত ও চীনের পারস্পরিক সম্পর্ক, আঞ্চলিক প্রভাব এবং কৌশলগত ভারসাম্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতীকে পরিণত হচ্ছে। ফলে আগামী দিনে এই প্রকল্পের অগ্রগতি শুধু উন্নয়ন নয়, বরং দক্ষিণ এশিয়ার কূটনৈতিক গতিপথেও প্রভাব ফেলতে পারে বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা।
Leave a Reply