আন্তর্জাতিক ডেস্ক
যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় ইসরাইল ও লেবাননের মধ্যে সদ্য স্বাক্ষরিত নিরাপত্তা রূপরেখা কার্যকর হওয়ার আগেই নতুন করে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছে। চুক্তি সইয়ের কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই দক্ষিণ লেবাননে ড্রোন হামলা চালিয়েছে ইসরাইল। একই সময়ে চুক্তিকে সম্পূর্ণভাবে প্রত্যাখ্যান করেছে লেবাননের সশস্ত্র সংগঠন হিজবুল্লাহ।
শনিবার (২৭ জুন) দক্ষিণ লেবাননের নাবাতিয়েহ আল-ফাওকা এলাকায় ইসরাইলি বাহিনীর ড্রোন হামলার ঘটনা ঘটে। হামলাস্থলটি ইসরাইল ঘোষিত নিরাপত্তা বলয়ের বাইরে হলেও সেখানে একজন সন্দেহভাজন ব্যক্তিকে লক্ষ্য করে অভিযান চালানো হয়েছে বলে জানিয়েছে ইসরাইলি সেনাবাহিনী।
ইসরাইলের দাবি, ওই ব্যক্তি নিরাপত্তার জন্য হুমকি হয়ে উঠেছিলেন। স্থলবাহিনী মোতায়েন না করেই নির্দিষ্ট লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে ড্রোন ব্যবহার করা হয়েছে।
এদিকে হামলার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই হিজবুল্লাহ মহাসচিব নাঈম কাসেম এক বিবৃতিতে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় হওয়া রূপরেখা চুক্তিকে ‘অবৈধ’ ও ‘অগ্রহণযোগ্য’ বলে ঘোষণা করেন। তিনি বলেন, লেবাননের ভূখণ্ডে ইসরাইলি সেনা অবস্থান অব্যাহত রেখে কোনো ধরনের রাজনৈতিক সমঝোতা গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।
তার দাবি, ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে পূর্ববর্তী সমঝোতায় লেবানন থেকে ইসরাইলি সেনা সম্পূর্ণ প্রত্যাহারের যে প্রতিশ্রুতি ছিল, সেটিই আগে বাস্তবায়ন করতে হবে। এরপর অন্য কোনো বিষয়ে আলোচনা হতে পারে।
নাঈম কাসেম আরও বলেন, লেবাননের বিভিন্ন এলাকায় হিজবুল্লাহকে নিরস্ত্রীকরণের শর্তের সঙ্গে ইসরাইলি সেনা প্রত্যাহারকে যুক্ত করা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ সিদ্ধান্ত। তার মতে, এমন শর্ত দেশটির নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্বকে দুর্বল করে দিতে পারে এবং ভবিষ্যতে ইসরাইলের প্রভাব আরও বাড়ার সুযোগ তৈরি করবে।
অন্যদিকে ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এই সমঝোতাকে দুই দেশের সম্পর্কের ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হিসেবে উল্লেখ করেছেন। এক ভাষণে তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় হওয়া এই চুক্তি সীমান্ত পরিস্থিতি স্থিতিশীল করার পথ তৈরি করবে এবং দক্ষিণ লেবাননের নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনায় নতুন কাঠামো গড়ে তুলবে।
নেতানিয়াহুর ভাষ্য অনুযায়ী, চুক্তির আওতায় নির্দিষ্ট নিরাপত্তা অঞ্চলে প্রয়োজন হলে ইসরাইলের উপস্থিতি বজায় রাখার বিষয়টি স্বীকৃতি পেয়েছে। একই সঙ্গে তিনি দাবি করেন, এই সমঝোতা লেবাননের অভ্যন্তরে ইরান ও হিজবুল্লাহর প্রভাব কমানোরও একটি বার্তা বহন করছে।
গত শুক্রবার (২৬ জুন) ওয়াশিংটনে অনুষ্ঠিত পঞ্চম দফার বৈঠকের পর লেবানন ও ইসরাইলের প্রতিনিধিরা এই রূপরেখা চুক্তিতে স্বাক্ষর করেন। পরে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তর চুক্তির বিস্তারিত প্রকাশ করে।
চুক্তি অনুযায়ী, ধাপে ধাপে লেবাননের পুরো ভূখণ্ডে রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার দায়িত্ব নেবে লেবানিজ সেনাবাহিনী। তবে এর আগে অ-রাষ্ট্রীয় সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর অস্ত্র সমর্পণ ও সামরিক অবকাঠামো অপসারণ নিশ্চিত করতে হবে।
এর বিনিময়ে ইসরাইলও পর্যায়ক্রমে লেবাননের বিভিন্ন এলাকা থেকে সেনা প্রত্যাহার করবে। প্রথম ধাপে দুইটি পরীক্ষামূলক নিরাপত্তা অঞ্চল গঠন করা হবে। সেখানে লেবানিজ সেনাবাহিনী পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ গ্রহণের পর আন্তর্জাতিক সহায়তায় পুনর্গঠন কার্যক্রম শুরু হবে এবং বাস্তুচ্যুত বাসিন্দারা নিরাপদে নিজ নিজ এলাকায় ফিরে যেতে পারবেন।
তবে চুক্তি ঘোষণার পরপরই হামলা এবং হিজবুল্লাহর সরাসরি প্রত্যাখ্যান মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি প্রতিষ্ঠার সম্ভাবনাকে আবারও অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দিয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, সব পক্ষের আস্থা অর্জন ছাড়া এই সমঝোতা বাস্তবায়ন করা কঠিন হতে পারে।
Leave a Reply