আন্তর্জাতিক ডেস্ক
দীর্ঘদিনের বৈরিতা, সামরিক উত্তেজনা এবং আঞ্চলিক অস্থিতিশীলতার পর অবশেষে সমঝোতার পথে হাঁটল যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান। বহুল আলোচিত ‘ইসলামাবাদ সমঝোতা স্মারক’ (Islamabad Memorandum of Understanding) স্বাক্ষরের মাধ্যমে দুই দেশ সংঘাত নিরসন এবং স্থায়ী শান্তির লক্ষ্যে নতুন কূটনৈতিক যাত্রা শুরু করেছে।
ফ্রান্সে অনুষ্ঠিত জি-৭ সম্মেলনের পর ভার্সাই প্রাসাদে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে চুক্তিতে আনুষ্ঠানিকভাবে সই করা হয়। অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাখোঁ, যিনি এই সমঝোতাকে মধ্যপ্রাচ্যের জন্য একটি ‘ঐতিহাসিক সুযোগ’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন।
চুক্তির মূল লক্ষ্য হলো চলমান সামরিক সংঘাতের অবসান, হরমুজ প্রণালিতে অবাধ নৌ চলাচল নিশ্চিত করা, আঞ্চলিক উত্তেজনা কমানো এবং ভবিষ্যৎ কূটনৈতিক আলোচনার ভিত্তি তৈরি করা। সমঝোতার আওতায় উভয় পক্ষ ৬০ দিনের মধ্যে একটি পূর্ণাঙ্গ ও চূড়ান্ত চুক্তিতে পৌঁছানোর জন্য আলোচনা চালিয়ে যেতে সম্মত হয়েছে।
বিশ্ব অর্থনীতির জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিকগুলোর একটি হলো হরমুজ প্রণালির পুনরায় উন্মুক্ত হওয়ার সম্ভাবনা। বিশ্বের উল্লেখযোগ্য অংশের জ্বালানি পরিবহন এই জলপথের ওপর নির্ভরশীল। সমঝোতা অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র ধাপে ধাপে ইরানের ওপর আরোপিত নৌ অবরোধ প্রত্যাহার করবে এবং ইরান আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক জাহাজের নিরাপদ চলাচল নিশ্চিত করবে।
এছাড়া চুক্তিতে পারমাণবিক ইস্যুকেও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। ইরান পারমাণবিক অস্ত্র না তৈরির প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করেছে এবং আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষণের আওতায় পারমাণবিক কার্যক্রম নিয়ে আলোচনায় রাজি হয়েছে। এর বিনিময়ে ভবিষ্যতে নিষেধাজ্ঞা শিথিলকরণ ও অর্থনৈতিক সহযোগিতার পথ খুলতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
চুক্তির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো লেবাননসহ বিভিন্ন ফ্রন্টে সামরিক কার্যক্রম বন্ধে নীতিগত ঐকমত্য। উভয় দেশ পরস্পরের সার্বভৌমত্বকে সম্মান জানানো এবং ভবিষ্যতে বলপ্রয়োগ বা সামরিক হুমকি থেকে বিরত থাকার অঙ্গীকার করেছে।
আন্তর্জাতিক মহলেও সমঝোতাটি ইতিবাচক সাড়া ফেলেছে। যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, জার্মানি ও ইতালির নেতারা এক যৌথ বিবৃতিতে এটিকে আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা ও বৈশ্বিক অর্থনীতি পুনরুদ্ধারের একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। একই সঙ্গে তারা চুক্তির দ্রুত ও কার্যকর বাস্তবায়নের ওপর জোর দিয়েছেন।
বিশ্লেষকদের মতে, চুক্তির সফল বাস্তবায়ন হলে শুধু মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা পরিস্থিতিই নয়, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, জ্বালানি বাজার এবং বৈশ্বিক অর্থনীতিতেও ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। তবে তারা সতর্ক করে বলেছেন, প্রকৃত সাফল্য নির্ভর করবে আগামী ৬০ দিনের আলোচনায় দুই পক্ষ কতটা আস্থা ও প্রতিশ্রুতি বজায় রাখতে পারে তার ওপর।
চার মাসেরও বেশি সময় ধরে চলা উত্তেজনা ও সংঘাতের পর এই সমঝোতা মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি প্রতিষ্ঠার পথে এক গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। এখন বিশ্বের নজর চুক্তির বাস্তবায়ন এবং পরবর্তী কূটনৈতিক অগ্রগতির দিকে।
Leave a Reply