তিস্তা নিউজ ডেস্ক
তারেক রহমান বলেছেন, বাংলাদেশের ইতিহাসে আর কখনো যেন কোনো ফ্যাসিবাদী বা স্বৈরাচারী শক্তি পুলিশ বাহিনীকে দেশ, জনগণ এবং গণতন্ত্রের বিরুদ্ধে ব্যবহার করতে না পারে—সেই অঙ্গীকার নিয়েই সবাইকে এগিয়ে যেতে হবে। তিনি বলেন, জনগণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্বে থাকা পুলিশ বাহিনীকে সবসময় সংবিধান, স্বাধীনতা এবং মানুষের অধিকার রক্ষার পক্ষে দাঁড়াতে হবে।
রোববার (১০ মে) রাজধানীর রাজারবাগ পুলিশ লাইনস-এ ‘পুলিশ সপ্তাহ-২০২৬’-এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। অনুষ্ঠানে পুলিশের বর্ণিল কুচকাওয়াজ, বিভিন্ন ইউনিটের শৃঙ্খলাবদ্ধ প্রদর্শনী এবং আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর সক্ষমতার নানা দিক তুলে ধরা হয়।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাসে রাজারবাগ পুলিশ লাইন্স এক অবিস্মরণীয় প্রতিরোধের প্রতীক। ১৯৭১ সালের সেই ভয়াল রাতে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে জীবন বাজি রেখে পুলিশের সদস্যরা যে প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিলেন, তা জাতির স্বাধীনতা সংগ্রামকে আরও বেগবান করেছিল। তিনি স্মরণ করেন, একদিকে চট্টগ্রামে মেজর জিয়ার স্বাধীনতার ঘোষণা এবং অন্যদিকে রাজারবাগে পুলিশের সশস্ত্র প্রতিরোধ—এই দুই ঘটনাই স্বাধীনতাকামী মানুষকে চূড়ান্ত লড়াইয়ের অনুপ্রেরণা দিয়েছিল।
তবে তিনি বলেন, মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস নিয়ে এখনও কিছু প্রশ্ন ও গবেষণার ক্ষেত্র রয়ে গেছে। বিশেষ করে ১৯৭১ সালের মার্চে যখন পশ্চিম পাকিস্তান থেকে বিপুলসংখ্যক সেনা ঢাকায় আনা হচ্ছিল, তখন সব পুলিশ সদস্যকে একসঙ্গে রাজারবাগে অবস্থান করানোর পেছনে তৎকালীন রাজনৈতিক নেতৃত্বের কৌশল কী ছিল—তা ভবিষ্যৎ গবেষণার বিষয় হতে পারে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
পুলিশ সদস্যদের উদ্দেশে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আজকের এই কুচকাওয়াজ শুধু আনুষ্ঠানিকতা নয়; বরং এটি শৃঙ্খলা, আত্মমর্যাদা, দায়িত্ববোধ এবং দেশের প্রতি অটুট অঙ্গীকারের প্রতীক। তিনি বলেন, দীর্ঘ দেড় দশকের আন্দোলন-সংগ্রাম এবং ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার রক্তক্ষয়ী গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে জনগণের প্রত্যাশার প্রতিফলন ঘটেছে বর্তমান গণতান্ত্রিক সরকারে। এখন দেশের মানুষ শান্তি, নিরাপত্তা ও ন্যায়বিচার চায়, আর সেই প্রত্যাশা পূরণে পুলিশের ভূমিকাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
তিনি আরও বলেন, জনগণের জানমাল রক্ষায় পুলিশকে সর্বোচ্চ আন্তরিকতা ও সক্ষমতা নিয়ে কাজ করতে হবে। জনগণের সঙ্গে মানবিক আচরণ, অভিযোগ গ্রহণে স্বচ্ছতা, নিরপেক্ষ তদন্ত এবং হয়রানিমুক্ত সেবা নিশ্চিত করার ওপরও গুরুত্বারোপ করেন তিনি। পুলিশের প্রতি জনগণের আস্থা বাড়াতে কমিউনিটি পুলিশিং ও জনসম্পৃক্ত কার্যক্রম আরও শক্তিশালী করার আহ্বান জানান প্রধানমন্ত্রী।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন প্রমাণ করেছে যে বাংলাদেশ পুলিশ চাইলে দক্ষতা, নিরপেক্ষতা ও পেশাদারিত্বের সঙ্গে দায়িত্ব পালন করতে সক্ষম। শুধু দেশেই নয়, আন্তর্জাতিক পরিসরেও বাংলাদেশ পুলিশ সুনামের সঙ্গে কাজ করছে। জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে বাংলাদেশ পুলিশের সদস্যরা সাহসিকতা, মানবিকতা ও পেশাদারিত্বের উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন বলেও তিনি উল্লেখ করেন। বিশেষ করে নারী পুলিশ সদস্যদের অবদান আন্তর্জাতিক মহলে প্রশংসিত হয়েছে বলে জানান তিনি।
তিনি বলেন, বর্তমান বিশ্বে প্রযুক্তিনির্ভর অপরাধ দ্রুত বাড়ছে। সাইবার অপরাধ, ডিপফেক, অনলাইন প্রতারণা, জঙ্গিবাদ, মাদক ও মানবপাচারের মতো চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় পুলিশকে আধুনিক প্রযুক্তিতে আরও দক্ষ করে গড়ে তুলতে হবে। এজন্য কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), ডিজিটাল ফরেনসিকস, ডেটা অ্যানালিটিকস এবং স্মার্ট নজরদারি ব্যবস্থার ব্যবহার বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।
শেষে প্রধানমন্ত্রী বলেন, “পুলিশ জনগণের বন্ধু—এই বিশ্বাসকে বাস্তবে পরিণত করতে হবে। জনগণের আস্থা, গণতন্ত্রের মূল্যবোধ এবং মানবাধিকারের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থেকে বাংলাদেশ পুলিশকে একটি আধুনিক, মানবিক ও জনবান্ধব বাহিনী হিসেবে গড়ে তুলতে হবে।”
Leave a Reply