আন্তর্জাতিক ডেস্ক
থালাপতি বিজয় তামিলনাড়ুর রাজনৈতিক ইতিহাসে নতুন অধ্যায়ের সূচনা করলেন। দীর্ঘ ছয় দশক ধরে চলা দ্রাবিড় দলগুলোর একচ্ছত্র আধিপত্য ভেঙে অভিনেতা থেকে রাজনীতিক হয়ে ওঠা এই জনপ্রিয় তারকা রাজ্যের নতুন মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে শপথ গ্রহণ করেছেন। রোববার (১০ মে) চেন্নাইয়ের জওহরলাল নেহেরু ইনডোর স্টেডিয়াম-এ আয়োজিত জাঁকজমকপূর্ণ অনুষ্ঠানে তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে দায়িত্ব নেন।
শপথ অনুষ্ঠানে ছিল উৎসবমুখর পরিবেশ। সাদা শার্ট ও গাঢ় রঙের ব্লেজারে মঞ্চে ওঠেন বিজয়। রাজ্যপালের সামনে শপথ পাঠের সময় স্টেডিয়ামজুড়ে সমর্থকদের করতালি, স্লোগান ও উচ্ছ্বাসে তৈরি হয় আবেগঘন পরিবেশ। ঐতিহাসিক এই মুহূর্তের সাক্ষী হতে দর্শকসারিতে উপস্থিত ছিলেন বিজয়ের বাবা-মা, পরিবারের সদস্য এবং চলচ্চিত্র ও রাজনৈতিক অঙ্গনের বিশিষ্ট ব্যক্তিরা।
অনুষ্ঠানে বিশেষভাবে নজর কাড়েন জনপ্রিয় অভিনেত্রী তৃষা কৃষ্ণান। নীল সিল্কের শাড়িতে তার উপস্থিতি ভক্তদের মধ্যে বাড়তি আগ্রহ তৈরি করে। দীর্ঘদিন ধরে বিজয়ের সহ-অভিনেত্রী হিসেবে পরিচিত তৃষার উপস্থিতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। এছাড়া দক্ষিণ ভারতীয় চলচ্চিত্র অঙ্গনের আরও অনেক পরিচিত মুখ অনুষ্ঠানে অংশ নেন।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই বিজয় শুধু একটি নির্বাচনী সাফল্য নয়; বরং তামিলনাড়ুর রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে বড় ধরনের পরিবর্তনের ইঙ্গিত। বহু বছর ধরে ডিএমকে ও এআইএডিএমকের মতো দ্রাবিড় দলগুলোর প্রভাবের বাইরে গিয়ে সাধারণ ভোটাররা নতুন নেতৃত্বের প্রতি আস্থা দেখিয়েছে। বিশেষ করে তরুণ ভোটার, প্রথমবারের ভোটার এবং শহুরে মধ্যবিত্তদের মধ্যে বিজয়ের জনপ্রিয়তা বড় ভূমিকা রেখেছে বলে মনে করা হচ্ছে।
নির্বাচনে বিজয়ের দল টিভিকে ১০৮টি আসন পেয়ে একক বৃহত্তম দল হিসেবে আবির্ভূত হলেও সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা থেকে কিছুটা পিছিয়ে ছিল। পরে কংগ্রেস, বামপন্থি দল এবং কয়েকটি আঞ্চলিক ছোট দলের নিঃশর্ত সমর্থনে সরকার গঠনের পথ সুগম হয়। অনুষ্ঠানে রাহুল গান্ধী-এর উপস্থিতি রাজনৈতিকভাবে বিশেষ তাৎপর্য বহন করে। কারণ দীর্ঘ কয়েক দশক পর কংগ্রেস আবারও তামিলনাড়ুর ক্ষমতাসীন জোটের অংশ হতে যাচ্ছে।
শপথ অনুষ্ঠানের আগে রাজ্যপাল রাজেন্দ্র আরলেকার-কে উষ্ণ অভ্যর্থনা জানিয়ে বিজয় রাজনৈতিক সৌজন্যের পরিচয় দেন। রাজনৈতিক ভিন্নমত থাকা সত্ত্বেও সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের প্রতি সম্মান প্রদর্শনের এই দৃশ্য অনেকের প্রশংসা কুড়ায়।
মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রথম বক্তব্যে বিজয় বলেন, জনগণের প্রত্যাশা পূরণই হবে তার সরকারের প্রধান লক্ষ্য। তিনি কর্মসংস্থান বৃদ্ধি, দুর্নীতি দমন, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যখাতের উন্নয়ন, তথ্যপ্রযুক্তি খাতে বিনিয়োগ এবং তরুণদের জন্য নতুন সুযোগ তৈরির প্রতিশ্রুতি দেন। একইসঙ্গে নারী নিরাপত্তা, কৃষকদের স্বার্থরক্ষা এবং শিল্পায়নের মাধ্যমে অর্থনীতি শক্তিশালী করার কথাও তুলে ধরেন তিনি।
তবে রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, বিজয়ের সামনে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো বিধানসভায় সংখ্যাগরিষ্ঠতা প্রমাণ এবং জোটের ভারসাম্য ধরে রাখা। নতুন রাজনৈতিক দল হিসেবে প্রশাসনিক অভিজ্ঞতার ঘাটতি, বিরোধী শিবিরের চাপ এবং জনগণের উচ্চ প্রত্যাশা—সব মিলিয়ে তার সরকারকে শুরু থেকেই কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হবে।
তারপরও সমর্থকদের বিশ্বাস, জনপ্রিয়তা, সাংগঠনিক শক্তি এবং তরুণদের সমর্থনকে কাজে লাগিয়ে বিজয় তামিলনাড়ুর রাজনীতিতে নতুন ধারার সূচনা করতে পারবেন। চলচ্চিত্রের পর্দা থেকে রাজ্যের প্রশাসনিক নেতৃত্বে উঠে আসা এই যাত্রাকে অনেকেই দক্ষিণ ভারতের রাজনীতিতে এক ঐতিহাসিক মোড় হিসেবেই দেখছেন।
Leave a Reply