কক্সবাজার প্রতিনিধি
টানা ভারী বর্ষণে কক্সবাজারে ভয়াবহ পাহাড়ধসের ঘটনায় মৃতের সংখ্যা বেড়ে ১১ জনে দাঁড়িয়েছে। নিহতদের মধ্যে নারী ও শিশুর সংখ্যাই বেশি। সবচেয়ে বেশি প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে উখিয়ার রোহিঙ্গা আশ্রয়শিবিরে, যেখানে পৃথক তিনটি ক্যাম্পে আটজনের মৃত্যু হয়েছে। এছাড়া কক্সবাজার সদর ও পেকুয়ায় আরও তিনজনের প্রাণহানির খবর পাওয়া গেছে।
মঙ্গলবার (৭ জুলাই) দুপুরে কক্সবাজার সদর উপজেলার দরিয়ানগর এলাকায় পাহাড়ধসে আরও এক নারীর মৃত্যু হলে মোট মৃতের সংখ্যা ১১ জনে পৌঁছায়। একই ঘটনায় শিশুসহ চারজন আহত হয়েছেন।
এর আগে রোববার গভীর রাত থেকে সোমবার ভোরের মধ্যে উখিয়ার ৭, ১১ ও ১৫ নম্বর রোহিঙ্গা ক্যাম্প এবং কক্সবাজার শহরের ছাত্তারঘোনা এলাকায় একের পর এক পাহাড়ধসের ঘটনা ঘটে। সোমবার দুপুরে পেকুয়া উপজেলার টৈটং ইউনিয়নেও পাহাড়ধসে প্রাণ হারায় এক শিশু।
সবচেয়ে মর্মান্তিক দুর্ঘটনাটি ঘটে উখিয়ার পালংখালী ইউনিয়নের ১৫ নম্বর জামতলী রোহিঙ্গা ক্যাম্পের ডি-৬ ব্লকে। রাত দেড়টার দিকে প্রবল বৃষ্টিতে পাহাড়ের বিশাল একটি অংশ ধসে পড়ে একটি বসতঘরের ওপর। এতে একই পরিবারের তিন সদস্য—৪৪ বছর বয়সী মোহাম্মদ কামাল হোসাইন, তার স্ত্রী হুমায়রা বেগম (৩৯) এবং চার বছরের ছেলে মোহাম্মদ আনাস—মাটিচাপা পড়ে নিহত হন। পরিবারের অন্য সাত সদস্যকে জীবিত উদ্ধার করা হলেও তারা আহত হন।
এর কিছুক্ষণ পর কুতুপালং ৭ নম্বর রোহিঙ্গা ক্যাম্পে পাহাড়ধসে একরাম (৭) নামে এক শিশুর মৃত্যু হয়। পরে রাত সাড়ে তিনটার দিকে বালুখালী ১১ নম্বর ক্যাম্পে আরেকটি পাহাড়ধসে একই পরিবারের চার সদস্য নিহত হন। তারা হলেন উম্মে হাবিবা (২৭), তানজিনা আক্তার (১৩), মোহাম্মদ রিহান (৫) ও হারুনুর রশিদ (৩)।
রোহিঙ্গা ক্যাম্পের বাইরে কক্সবাজার শহরের ছাত্তারঘোনা এলাকায় পাহাড়ধসে স্থানীয় বাসিন্দা আলী আকবর নিহত হন। এছাড়া পেকুয়া উপজেলার টৈটং ইউনিয়নের খলিফামুরা এলাকায় পাহাড়ধসে সাত বছর বয়সী মিনহাজ উদ্দিনের মৃত্যু হয়। সর্বশেষ মঙ্গলবার দরিয়ানগরে আরও এক নারীর মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করেছে প্রশাসন।
উখিয়া ফায়ার সার্ভিসের কর্মকর্তারা জানান, দুর্গম ও ঝুঁকিপূর্ণ পরিবেশের মধ্যেও রাতভর উদ্ধার অভিযান চালিয়ে হতাহতদের উদ্ধার করা হয়েছে। অনেক স্থানে নরম মাটি ও অব্যাহত বৃষ্টির কারণে উদ্ধারকাজ ব্যাহত হয়।
কক্সবাজারের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. অহিদুর রহমান বলেন, নিহতদের মরদেহ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য কক্সবাজার সদর হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়েছে। প্রয়োজনীয় আইনি প্রক্রিয়া শেষে মরদেহ স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হবে। তিনি সবাইকে পাহাড়ের ঢাল ও ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় বসবাস থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানান।
এদিকে শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার (আরআরআরসি) মোহাম্মদ মিজানুর রহমান বলেন, রোহিঙ্গা ক্যাম্পের বিভিন্ন স্থানে দীর্ঘদিন ধরে অবৈধভাবে পাহাড় কাটার ফলে ভূমিধসের ঝুঁকি অনেক বেড়েছে। বারবার সতর্ক করার পরও কিছু অসাধু চক্র পাহাড় কাটা অব্যাহত রেখেছে। এর ফলে এমন মর্মান্তিক দুর্ঘটনা ঘটেছে বলে তিনি মন্তব্য করেন। দায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ারও দাবি জানান তিনি।
বর্ষা মৌসুমে রোহিঙ্গা ক্যাম্পের বাসিন্দাদের মধ্যে আতঙ্ক বিরাজ করছে। অনেকের অভিযোগ, পাহাড় কেটে তৈরি করা ঢালে বাঁশ ও ত্রিপলের অস্থায়ী ঘরে বসবাস করায় ভারী বৃষ্টি হলেই ভূমিধসের আশঙ্কা তৈরি হয়। প্রতিটি বর্ষায় প্রাণহানি ও ঘরবাড়ি হারানোর ভয় নিয়ে দিন কাটাতে হয় তাদের।
শুধু রোহিঙ্গা ক্যাম্প নয়, কক্সবাজার সদর, উখিয়া, রামু ও পেকুয়াসহ জেলার বিভিন্ন পাহাড়ঘেরা এলাকায় প্রায় তিন লাখ মানুষ এখনও ভূমিধসের ঝুঁকিতে বসবাস করছেন। টানা বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকায় প্রশাসন সবাইকে নিরাপদ আশ্রয়ে সরে যেতে এবং ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়ের পাদদেশ থেকে দূরে থাকার আহ্বান জানিয়েছে।
Leave a Reply