তিস্তা টিভি ডেস্ক
হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে দীর্ঘদিন ধরে চলমান কার্গো জট নিরসনে স্বল্পমেয়াদি ও দীর্ঘমেয়াদি সমন্বিত পরিকল্পনা গ্রহণের ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির। তিনি বলেছেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে শুধু তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নয়, ভবিষ্যতের চাহিদা বিবেচনায় আধুনিক কার্গো ব্যবস্থাপনা গড়ে তুলতে হবে। এজন্য বিমানবন্দরের বাইরে আন্তর্জাতিক মানের একটি পৃথক কার্গো ভিলেজ প্রতিষ্ঠা এখন সময়ের দাবি।
বৃহস্পতিবার (২৫ জুন) বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সম্মেলন কক্ষে বাংলাদেশ ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) মধ্যে বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সম্প্রসারণে বিদ্যমান নন-ট্যারিফ বাধাসমূহ নিয়ে অনুষ্ঠিত এক বৈঠকে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। বৈঠকে বিশেষভাবে বিমানবন্দরের কার্গো হ্যান্ডলিং সংকট এবং তা নিরসনের উপায় নিয়ে আলোচনা করা হয়।
বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, বর্তমানে বিমানবন্দরে যে পরিমাণ পণ্য প্রতিদিন প্রবেশ করছে, প্রায় একই পরিমাণ পণ্য খালাসও হচ্ছে। কিন্তু পূর্বে জমে থাকা বিপুল পরিমাণ কার্গো এখনও রয়ে গেছে। ফলে কাঙ্ক্ষিত হারে জট কমছে না। বিশেষ করে সাপ্তাহিক ছুটির দিনে কাস্টমস ও সংশ্লিষ্ট সেবা কার্যক্রম সীমিত থাকায় সমস্যাটি আরও জটিল হয়ে উঠছে।
তিনি বলেন, “স্থায়ী সমাধান বাস্তবায়ন না হওয়া পর্যন্ত ছুটির দিনেও কাস্টমস, কার্গো হ্যান্ডলিং ও সংশ্লিষ্ট সেবা চালু রাখতে হবে। বিমানবন্দরকে কোনোভাবেই গুদাম হিসেবে ব্যবহার করা যাবে না। এটি মূলত পণ্য পরিবহনের একটি ট্রানজিট পয়েন্ট। পণ্য দীর্ঘ সময় বিমানবন্দরে আটকে থাকলে ব্যবসা-বাণিজ্য ও সরবরাহ ব্যবস্থায় নেতিবাচক প্রভাব পড়ে।”
খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির আরও বলেন, আগামী এক দশকের চাহিদা মাথায় রেখে দেশের কার্গো অবকাঠামো উন্নয়ন করতে হবে। বিপজ্জনক (হ্যাজার্ডাস), সাধারণ (নন-হ্যাজার্ডাস), দ্রুত খালাসযোগ্য (ফাস্ট-মুভিং) এবং দীর্ঘমেয়াদি সংরক্ষণযোগ্য (স্লো-মুভিং) পণ্যের জন্য আলাদা ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলা প্রয়োজন। এতে কার্গো পরিচালনা আরও দক্ষ, নিরাপদ ও আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন হবে।
তিনি জানান, বিমানবন্দরের বাইরে আধুনিক সংরক্ষণাগার, স্ক্যানিং সুবিধা, কাস্টমস সাপোর্ট এবং উন্নত লজিস্টিক সেবাসহ একটি পূর্ণাঙ্গ কার্গো ভিলেজ প্রতিষ্ঠার বিষয়টি গুরুত্বসহকারে বিবেচনা করা হচ্ছে। এতে বিমানবন্দরের ওপর চাপ কমবে এবং পণ্য পরিবহন প্রক্রিয়া আরও দ্রুত হবে।
সভায় বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রী আফরোজা খানম বলেন, কার্গো জট শুধু রপ্তানিকারক ও আমদানিকারকদের জন্য সমস্যা সৃষ্টি করছে না, বরং আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বাংলাদেশের ভাবমূর্তিকেও ক্ষতিগ্রস্ত করছে। তিনি সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোকে আগামী সাত দিনের মধ্যে দৃশ্যমান অগ্রগতি দেখানোর আহ্বান জানান।
তিনি বলেন, “বর্তমান পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে যেকোনো সময় নিরাপত্তা ও দুর্ঘটনার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। তাই দ্রুত কার্গো জট কমিয়ে বিমানবন্দরের স্বাভাবিক কার্যক্রম নিশ্চিত করা জরুরি।”
আফরোজা খানম আরও বলেন, আটক ও বাজেয়াপ্ত পণ্যের দ্রুত নিষ্পত্তি, বিকল্প গুদাম সুবিধা বৃদ্ধি এবং আধুনিক ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে কার্গোর চাপ অনেকাংশে কমানো সম্ভব। তিনি ব্যবসায়ী মহলের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, সমস্যা সমাধানে সংলাপ ও সমন্বয়ের পথ বেছে নিতে হবে; কোনো ধরনের কর্মবিরতি বা হুমকি পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলবে।
বৈঠকে অংশ নেওয়া ব্যবসায়ী প্রতিনিধি, কার্গো অপারেটর ও সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা বলেন, বাংলাদেশের রপ্তানি বাণিজ্যের বড় অংশ এখন সময়নির্ভর। বিশেষ করে তৈরি পোশাক, ওষুধ, কৃষিপণ্য ও উচ্চমূল্যের রপ্তানি পণ্যের ক্ষেত্রে দ্রুত কার্গো ব্যবস্থাপনা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিমানবন্দরের কার্গো অবকাঠামোর আধুনিকীকরণ এবং দ্রুত পণ্য খালাস নিশ্চিত করা গেলে ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ বৈশ্বিক বাজারে বাংলাদেশের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা আরও বৃদ্ধি পাবে।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সচিব আতাউর রহমান খানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত বৈঠকে কাস্টমস কর্তৃপক্ষ, বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ, ব্যবসায়ী সংগঠন, রপ্তানিকারক প্রতিনিধি এবং বিভিন্ন সরকারি সংস্থার কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
সভায় সিদ্ধান্ত হয়, কার্গো জট নিরসনে স্বল্পমেয়াদি পদক্ষেপ দ্রুত বাস্তবায়নের পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি অবকাঠামো উন্নয়ন পরিকল্পনা চূড়ান্ত করতে আগামী সপ্তাহে পুনরায় বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে।
Leave a Reply