ক্রীড়া ডেস্ক
বিশ্ব ফুটবলের ইতিহাসে অসংখ্য রেকর্ড, শিরোপা ও ব্যক্তিগত অর্জনের মাধ্যমে নিজেকে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছেন লিওনেল মেসি। মাঠের পারফরম্যান্সের পাশাপাশি কোটি কোটি ভক্তের হৃদয়ে জায়গা করে নেওয়া এই আর্জেন্টাইন মহাতারকাকে এবার সম্মান জানানো হলো এক ব্যতিক্রমী আয়োজনের মাধ্যমে। তার ৩৯তম জন্মদিন উপলক্ষে আর্জেন্টিনার প্যাটাগোনিয়া অঞ্চলের কাট্রাল কো শহরে উন্মোচন করা হয়েছে ৮৫ ফুট উঁচু এক বিশাল ভাস্কর্য, যা বর্তমানে মেসির প্রতি নিবেদিত বিশ্বের সবচেয়ে বড় স্মারকগুলোর অন্যতম।
আর্জেন্টিনার তেলসমৃদ্ধ ছোট্ট শহর কাট্রাল কো-তে স্থাপিত ভাস্কর্যটি উচ্চতায় প্রায় ২৬ মিটার। বিশাল এই শিল্পকর্ম নির্মাণে ব্যবহৃত হয়েছে প্রায় ৭০ টন ইস্পাত এবং পুরো কাজ শেষ করতে সময় লেগেছে প্রায় ১৮ মাস। স্থানীয় শিল্পী আলদো বেরোইসার নকশা ও তত্ত্বাবধানে নির্মিত ভাস্কর্যটি ইতোমধ্যেই দেশ-বিদেশের ফুটবলপ্রেমীদের দৃষ্টি কাড়তে শুরু করেছে।
মেসির জন্মদিনকে ঘিরে এই আয়োজন আরও বেশি তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে ওঠে তার সাম্প্রতিক ঐতিহাসিক অর্জনের কারণে। জন্মদিনের আগে বিশ্বকাপের মঞ্চে নতুন এক মাইলফলক স্পর্শ করেন আর্জেন্টাইন অধিনায়ক। অস্ট্রিয়ার বিপক্ষে জোড়া গোল করে তিনি বিশ্বকাপ ইতিহাসের সর্বোচ্চ গোলদাতার তালিকায় শীর্ষস্থান দখল করেন। তার ১৭তম ও ১৮তম বিশ্বকাপ গোল তাকে জার্মান কিংবদন্তি মিরোস্লাভ ক্লোসার রেকর্ড ছাড়িয়ে যেতে সহায়তা করে। এই অর্জনের পরপরই উন্মোচিত হয় তার সম্মানে নির্মিত এই বিশাল ভাস্কর্য।
ভাস্কর্যের নকশায় ফুটিয়ে তোলা হয়েছে মেসির ক্যারিয়ারের সবচেয়ে আবেগঘন মুহূর্তগুলোর একটি। ২০২২ সালের কাতার বিশ্বকাপ জয়ের পর লুসাইল স্টেডিয়ামের ঘাসে হাঁটু গেড়ে বসে থাকা মেসির সেই স্মরণীয় দৃশ্যকে কেন্দ্র করেই নির্মিত হয়েছে ভাস্কর্যটি। একই সঙ্গে এতে দেখা যায়, এক হাতে আর্জেন্টিনার জার্সি ধরে অন্য হাতের তর্জনী আকাশের দিকে উঁচিয়ে থাকা তার বিখ্যাত উদযাপনের ভঙ্গি। দীর্ঘদিন ধরেই গোল করার পর এই ভঙ্গিতে উদযাপন করে আসছেন মেসি, যা তিনি তার প্রয়াত দাদির স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে করে থাকেন।
স্থানীয় কর্তৃপক্ষের মতে, এই ভাস্কর্য শুধু একজন ফুটবলারের প্রতি শ্রদ্ধা নয়, বরং আর্জেন্টিনার জাতীয় গৌরব, ঐক্য এবং বিশ্বমঞ্চে দেশের সাফল্যের প্রতীক হিসেবেও বিবেচিত হবে। পর্যটন সংশ্লিষ্টদের ধারণা, স্মারকটি আগামী দিনে কাট্রাল কো-কে আন্তর্জাতিক পর্যটনের একটি গুরুত্বপূর্ণ আকর্ষণীয় গন্তব্যে পরিণত করতে পারে।
মেসির প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে এর আগেও বিশ্বের বিভিন্ন দেশে নানা ধরনের স্থাপনা ও স্মারক নির্মিত হয়েছে। সম্প্রতি ভারতে তার সম্মানে নির্মিত ৭০ ফুট উচ্চতার একটি মূর্তি ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। তবে নিরাপত্তাজনিত কারণে স্থানীয় প্রশাসন সেটি সরিয়ে নেওয়ার নির্দেশ দেয়। প্রবল বাতাসে মূর্তিটি দুলতে শুরু করায় দুর্ঘটনার আশঙ্কা তৈরি হয়েছিল।
শুধু ভাস্কর্য বা মূর্তিই নয়, মেসিকে ঘিরে ভক্তদের আবেগের প্রকাশ ঘটছে নানাভাবে। আর্জেন্টিনার রাজধানী বুয়েন্স আইয়ার্সের উপকণ্ঠে সম্প্রতি তৈরি হয়েছে একটি বিশাল ম্যুরাল, যেখানে ১ হাজার ৩০০-এর বেশি ভক্ত নিজেদের নাম যুক্ত করে অংশগ্রহণ করেছেন। প্রায় ২০ ফুট চওড়া ও ১৮ ফুট উঁচু এই ম্যুরাল সম্পন্ন করতে শিল্পী লিওনেল গার্সিয়ার সময় লেগেছে ১৮ দিন। শিল্পকর্মটি মেসির প্রতি আর্জেন্টাইন জনগণের ভালোবাসা ও কৃতজ্ঞতার প্রতীক হিসেবে ইতোমধ্যেই জনপ্রিয়তা পেয়েছে।
মেসি নিজেও ভক্তদের এই ভালোবাসায় মুগ্ধ। জন্মদিন উপলক্ষে প্রকাশিত এক ভিডিও বার্তায় তিনি সমর্থকদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে পাওয়া ভালোবাসা, সম্মান এবং শুভেচ্ছা তাকে সবসময় অনুপ্রাণিত করে। ভক্তদের এমন অকৃত্রিম সমর্থন তার কাছে বিশেষ অর্থ বহন করে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
চার দশকের দোরগোড়ায় দাঁড়িয়েও লিওনেল মেসি এখনও বিশ্ব ফুটবলের সবচেয়ে আলোচিত ও প্রভাবশালী নামগুলোর একটি। মাঠের রেকর্ড, অর্জন এবং কোটি ভক্তের ভালোবাসা তাকে শুধু একজন ফুটবলার নয়, বরং একটি বৈশ্বিক সাংস্কৃতিক প্রতীকে পরিণত করেছে। কাট্রাল কো-তে নির্মিত ৮৫ ফুট উঁচু এই ভাস্কর্য সেই অমর জনপ্রিয়তারই নতুন এক স্মারক হয়ে থাকল।
Leave a Reply