তিস্তা টিভি ডেস্ক
১,৩০০ উন্নয়ন প্রকল্প বর্তমান সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। তিনি বলেছেন, বিগত সরকারের সময় নেওয়া বিপুলসংখ্যক উন্নয়ন প্রকল্পের অনেকগুলোর বাস্তবতা, প্রয়োজনীয়তা এবং অর্থনৈতিক কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। ফলে এসব প্রকল্প পর্যালোচনা করে অগ্রাধিকারভিত্তিতে বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার।
বৃহস্পতিবার (২৫ জুন) রাজধানীতে অনুষ্ঠিত ‘ডিবেটিং বাজেট অ্যান্ড বিওন্ড’ শীর্ষক এক সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে অর্থমন্ত্রী এসব কথা বলেন।
তিনি জানান, দায়িত্ব গ্রহণের পর সরকার প্রায় ১ হাজার ৩০০ উন্নয়ন প্রকল্প পেয়েছে, যা বর্তমানে সরকারের জন্য বড় ধরনের চাপের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রকল্পগুলোর অনেকগুলোর বাস্তবায়ন অগ্রগতি, ব্যয় এবং সম্ভাব্য সুফল নিয়ে নতুন করে মূল্যায়ন করা হচ্ছে।
অর্থমন্ত্রী বলেন, “আমরা দায়িত্বে এসে ১ হাজার ৩০০ উন্নয়ন প্রকল্প পেয়েছি। এগুলো আমাদের জন্য এমন এক পরিস্থিতি তৈরি করেছে, যা না সহজে বাস্তবায়ন করা যাচ্ছে, না বাদ দেওয়া যাচ্ছে। তাই আমরা প্রকল্পগুলো পুনর্মূল্যায়ন করছি এবং প্রতিটি প্রকল্পের অগ্রগতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করবো।”
তিনি বলেন, সরকারি ব্যয় ব্যবস্থাপনায় দক্ষতা বৃদ্ধি এবং প্রকল্প বাস্তবায়নে অপ্রয়োজনীয় জটিলতা কমাতে সরকার ডিরেগুলেশন বা বিধিনিষেধ শিথিল করার পদক্ষেপ নিচ্ছে। একই সঙ্গে প্রকল্প বাস্তবায়নে জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা হবে।
সেমিনারে সৃজনশীল অর্থনীতির সম্ভাবনা নিয়ে কথা বলতে গিয়ে অর্থমন্ত্রী বলেন, গ্রামীণ অর্থনীতিকে শক্তিশালী করতে ঐতিহ্যবাহী হস্তশিল্প, মৃৎশিল্প, শীতলপাটি, বাঁশ ও বেতশিল্পসহ বিভিন্ন সৃজনশীল খাতকে নতুনভাবে মূল্যায়ন করা হচ্ছে। এসব পণ্যের বাজার সম্প্রসারণ এবং মূল্য সংযোজন করা গেলে লাখো কারিগরের আয় উল্লেখযোগ্য হারে বাড়ানো সম্ভব।
তিনি বলেন, বর্তমানে ৭০০ টাকায় বিক্রি হওয়া একটি পণ্য যদি উন্নত বিপণন ও ব্র্যান্ডিংয়ের মাধ্যমে ২ হাজার টাকায় বিক্রি করা যায়, তাহলে কারিগররা সরাসরি লাভবান হবেন। মানুষের আয় বাড়লে দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিও শক্তিশালী হবে।
লোকসংগীত, সংস্কৃতি, চলচ্চিত্র ও বিনোদন শিল্পকে অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ খাত হিসেবে উল্লেখ করে অর্থমন্ত্রী বলেন, সরকার এসব খাতকে আয় ও কর্মসংস্থানের নতুন উৎস হিসেবে গড়ে তুলতে চায়। ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ও আন্তর্জাতিক বাজারে সাংস্কৃতিক পণ্যের প্রসার ঘটিয়ে নতুন অর্থনৈতিক সম্ভাবনা তৈরি করা সম্ভব।
তিনি বলেন, “গান, সংস্কৃতি, চলচ্চিত্র—সবকিছুকেই আমরা অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের অংশ করতে চাই। বিনোদন শিল্পও দেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ রাজস্ব ও কর্মসংস্থানের উৎস হতে পারে।”
দেশের ঐতিহাসিক ও ঐতিহ্যবাহী স্থানগুলো সংস্কার ও উন্নয়নের মাধ্যমে পর্যটন শিল্পের সঙ্গে যুক্ত করার পরিকল্পনার কথাও তুলে ধরেন অর্থমন্ত্রী। তিনি বলেন, দেশের প্রত্নতাত্ত্বিক ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে কাজে লাগিয়ে পর্যটন খাতের বিকাশ ঘটানো গেলে বৈদেশিক মুদ্রা আয় ও স্থানীয় কর্মসংস্থান বাড়বে।
চলতি বাজেটে সৃজনশীল অর্থনীতির বিকাশে বিশেষ বরাদ্দ রাখা হয়েছে বলেও জানান তিনি।
আর্থিক খাতে নিয়োগের বিষয়ে কথা বলতে গিয়ে অর্থমন্ত্রী বলেন, বর্তমান সরকার রাজনৈতিক বিবেচনার পরিবর্তে পেশাদারিত্ব ও যোগ্যতাকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে। তিনি দাবি করেন, আর্থিক খাতের গুরুত্বপূর্ণ পদগুলোতে নিয়োগের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক প্রভাব রাখা হয়নি।
তিনি বলেন, “একজন ছাড়া আর কাউকেই আমি ব্যক্তিগতভাবে চিনি না। নিয়োগের ক্ষেত্রে পেশাগত যোগ্যতাকেই গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।”
কৃষি খাতকে সরকারের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত খাতগুলোর একটি উল্লেখ করে অর্থমন্ত্রী বলেন, খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, গ্রামীণ অর্থনীতিকে শক্তিশালী করা এবং নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি সরকারের প্রধান লক্ষ্যগুলোর অন্যতম।
তিনি জানান, আধুনিক কৃষি প্রযুক্তির ব্যবহার বৃদ্ধি, কৃষিপণ্যের সংরক্ষণ ও প্রক্রিয়াজাতকরণ সুবিধা সম্প্রসারণ এবং কৃষকদের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে বিভিন্ন কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।
অর্থমন্ত্রী বলেন, কৃষি শুধু খাদ্য উৎপাদনের খাত নয়, এটি দেশের অর্থনীতির ভিত্তি। তাই কৃষির উন্নয়নকে কেন্দ্র করেই গ্রামীণ অর্থনীতির টেকসই অগ্রগতি নিশ্চিত করতে চায় সরকার।
সেমিনারে অর্থনীতিবিদ, গবেষক, নীতিনির্ধারক এবং বিভিন্ন খাতের বিশেষজ্ঞরা বাজেট বাস্তবায়ন, উন্নয়ন প্রকল্পের কার্যকারিতা এবং টেকসই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জনের বিভিন্ন দিক নিয়ে মতামত তুলে ধরেন।
Leave a Reply