1. tistanewsbd2017@gmail.com : Tista24 :
May 25, 2026, 6:19 pm

যুদ্ধবিধ্বস্ত গাজায় টানা তৃতীয় বছর ঈদহীন জীবন

Reporter Name
  • Update Time : Monday, May 25, 2026
  • 22 Time View

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

অবরুদ্ধ গাজা উপত্যকায় এবারও নেই ঈদের আনন্দ। টানা তৃতীয় বছরের মতো কোরবানির ঈদ উদযাপন থেকে বঞ্চিত হতে যাচ্ছেন উপত্যকার অধিকাংশ মানুষ। ইসরাইলের ধারাবাহিক হামলা, কঠোর অবরোধ, খাদ্য ও জ্বালানি সংকট এবং ব্যাপক বাস্তুচ্যুতির কারণে গাজার গবাদিপশু খাত প্রায় সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে গেছে। ফলে বহু পরিবারের কাছে কোরবানি এখন কেবল স্মৃতি।

একসময় ঈদুল আজহাকে ঘিরে গাজাজুড়ে দেখা যেত উৎসবের আমেজ। পশুর হাট, কোরবানির প্রস্তুতি, দরিদ্রদের মাঝে মাংস বিতরণ—সব মিলিয়ে প্রাণবন্ত হয়ে উঠত পুরো উপত্যকা। কিন্তু যুদ্ধবিধ্বস্ত বাস্তবতায় সেই দৃশ্য এখন অতীত।

গাজা সিটির খামারি মাজেন আল-জেরজাউই বলেন, যুদ্ধের আগে ঈদের মৌসুমে তিনি শত শত গরু, ভেড়া ও ছাগল বিক্রি করতেন। এখন তার খামারে একটি পশুও নেই। জীবিকার তাগিদে তিনি ছোট একটি রেস্তোরাঁ চালাচ্ছেন, যেখানে কোনোভাবে গাজায় ঢোকা সীমিত পরিমাণ হিমায়িত মাংস বিক্রি করা হয়।

তার ভাষায়, “আগে এই সময়ে অন্তত ২০০ পশু বিক্রি করতাম। এখন ইসরাইল জীবন্ত পশু ঢুকতেই দিচ্ছে না। মানুষের শুধু বেঁচে থাকার মতো ন্যূনতম জিনিসই দেওয়া হচ্ছে।”

যুদ্ধের আগে প্রতি বছর কোরবানির চাহিদা মেটাতে গাজায় প্রায় ৪০ থেকে ৬০ হাজার ভেড়া ও বাছুর আমদানি করা হতো। কিন্তু ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে শুরু হওয়া যুদ্ধ ও অবরোধের কারণে সেই সরবরাহ পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়।

গাজা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির তথ্যমতে, ইসরাইলি হামলা ও কৃষি সরঞ্জাম আমদানিতে নিষেধাজ্ঞার কারণে গাজার ৯০ শতাংশের বেশি গবাদিপশু খাত ধ্বংস হয়েছে। খামার, গোয়ালঘর, পশুখাদ্যের গুদাম, ভেটেরিনারি ক্লিনিক—সবকিছুই হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংস হয়ে গেছে।

জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও) জানিয়েছে, যুদ্ধ শুরুর পরপরই গাজার ৮০ শতাংশ ভেড়া এবং ৭০ শতাংশ ছাগল মারা যায়। খাদ্য ও পানির অভাব, অব্যাহত বোমাবর্ষণ এবং নিরাপদ আশ্রয়ের সংকটে পশুগুলোকে বাঁচিয়ে রাখা সম্ভব হয়নি।

গাজার কৃষি মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রাফাত আসালিয়া জানান, যুদ্ধের আগে গাজায় প্রায় ৬০ হাজার ভেড়া ও ছাগল ছিল। বর্তমানে সেই সংখ্যা কমে দাঁড়িয়েছে মাত্র ৩ হাজারে। গরু বা বাছুর প্রায় বিলুপ্ত হয়ে গেছে। যেসব অল্প কিছু পশু এখনও রয়েছে, সেগুলো যাযাবর রাখালদের কাছে থাকলেও বিক্রির জন্য নয়।

তিনি বলেন, “পানি তোলার পাম্প, কূপ ও বিদ্যুৎব্যবস্থা ধ্বংস হয়ে যাওয়ায় গবাদিপশু খাত পুনরুজ্জীবিত করার কোনো বাস্তব সুযোগ নেই।”

পশুর সংকটের কারণে বাজারে দামও সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে গেছে। যুদ্ধের আগে যে ভেড়া ৫০০ থেকে ৬০০ ডলারে পাওয়া যেত, এখন সেটির দাম প্রায় ৭ হাজার ডলার পর্যন্ত পৌঁছেছে। এই পরিস্থিতিতে কোরবানি দেওয়ার কথা অধিকাংশ পরিবার কল্পনাও করতে পারছে না।

খামারিরা জানান, বারবার এলাকা ছাড়ার নির্দেশের কারণে অনেকেই বেঁচে থাকা পশু পানির দামে বিক্রি করে দিতে বাধ্য হয়েছেন। কেউ কেউ শুধু এক বস্তা ময়দা বা সামান্য খাবারের বিনিময়েও পশু ছেড়ে দিয়েছেন।

গাজার স্কুলশিক্ষক মুহাম্মদ আবুরিয়ালা বলেন, “টানা তিন বছর আমরা ঈদের আনন্দ পাইনি। কোরবানির সেই অনুভূতি, আত্মীয়স্বজন ও গরিবদের মাঝে মাংস বিতরণের আনন্দ—সব হারিয়ে গেছে। এখন মানুষ শুধু খাবারের চিন্তায় দিন কাটায়।”

জাতিসংঘ সমর্থিত আইপিসি মূল্যায়ন অনুযায়ী, গাজার প্রায় ১৬ লাখ মানুষ বর্তমানে চরম খাদ্য নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন। বহু পরিবার দিনে একবারও খাবার জোগাড় করতে পারছে না। অনেক শিশু মাসের পর মাস তাজা মাংস তো দূরের কথা, পর্যাপ্ত পুষ্টিকর খাবারও পাচ্ছে না।

বিশ্লেষকদের মতে, গবাদিপশু খাতের এই ধ্বংস শুধু একটি ধর্মীয় উৎসবকে থামিয়ে দেয়নি; বরং এর সঙ্গে জড়িত হাজারো খামারি, পশুচিকিৎসক, কসাই, পরিবহন শ্রমিক ও রেস্তোরাঁ ব্যবসায়ীর জীবন-জীবিকাও বিপর্যস্ত করেছে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, দীর্ঘ অবরোধ ও সরবরাহ নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে গাজার অর্থনীতি ও সমাজকে পুরোপুরি পরনির্ভরশীল করে তোলার চেষ্টা চলছে। আর সেই সংকটের সবচেয়ে বড় মূল্য দিচ্ছে সাধারণ মানুষ—যাদের কাছে ঈদ এখন আনন্দ নয়, বরং বেঁচে থাকার আরেকটি সংগ্রামের নাম।

Please Share This Post in Your Social Media

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category
© All rights reserved © 2019 Jaldhaka IT Park
Theme Customized By LiveTV