ক্রীড়া ডেস্ক
লেক অন্টারিওর বাতাসে তখন উত্তেজনার ভারী চাপ। ছোট্ট ভেন্যু, সীমিত আসনসংখ্যা, কিন্তু আবেগে সেটা পুরো মহাদেশকে ছাপিয়ে যাচ্ছে। কানাডার এই টরন্টো স্টেডিয়ামে, যেখানে আসন প্রায় ৪৩ হাজারের কাছাকাছি, এবার বিশ্বকাপের নকআউট রাত—যেখানে ফুটবল শুধু খেলা নয়, সময়ের সঙ্গে এক নির্মম লড়াই। পর্তুগাল বনাম ক্রোয়েশিয়া—শুধু শেষ ষোলো নয়, দুই যুগের দুই প্রতীকী কিংবদন্তির মুখোমুখি সংঘর্ষ। এক পাশে ক্রিস্তিয়ানো রোনাল্ডো, অন্য পাশে লুকা মদ্রিচ। দুজনেই চল্লিশের ঘরে, দুজনেই জানেন এটাই হয়তো তাদের শেষ বিশ্বকাপের অধ্যায়। তাই এই ম্যাচটা জয়-পরাজয়ের পাশাপাশি স্মৃতিরও পরীক্ষা। একসময় রিয়াল মাদ্রিদের একই ড্রেসিংরুম ভাগ করা এই দুই তারকা আজ ভিন্ন শিবিরে দাঁড়িয়ে। একজন গোলকে ইতিহাস বানিয়েছেন, অন্যজন পাস আর নিয়ন্ত্রণে ফুটবলকে শিল্পে রূপ দিয়েছেন। এখন তাদের লড়াই ভবিষ্যতের জন্য নয়, অতীতকে ধরে রাখার লড়াই।
পর্তুগালের গ্রুপ পর্ব ছিল অসম ছন্দের। তিন ম্যাচে তারা অপরাজিত থাকলেও ধারাবাহিকতা পুরোপুরি ছিল না। ডিআর কঙ্গোর সঙ্গে ১–১ ড্র দিয়ে শুরু, এরপর উজবেকিস্তানের বিপক্ষে ৫–০ গোলের বড় জয়, আর শেষ ম্যাচে কলম্বিয়ার সঙ্গে গোলশূন্য ড্র। তিন ম্যাচে ৬ গোল করেছে, হজম করেছে মাত্র ১টি। তবে খেলায় ছিল ওঠানামা—কখনও বল নিয়ন্ত্রণে আধিপত্য, আবার কখনও আক্রমণে অস্থিরতা। তবুও পর্তুগালের সবচেয়ে বড় শক্তি তাদের তারকাবহুল আক্রমণভাগ। ব্রুনো ফার্নান্দেজ আক্রমণ তৈরি করেন, বার্নার্দো সিলভা জায়গা বদলে প্রতিপক্ষকে বিভ্রান্ত করেন, ভিতিনিয়া মাঝমাঠে ভারসাম্য আনেন, আর জোয়াও নেভেস তরুণ সাহসে গতি যোগ করেন। সব আলো আবারও রোনাল্ডোর দিকে। ৪১ বছর বয়সেও তিনি থামেননি। উজবেকিস্তানের বিপক্ষে জোড়া গোল করে তিনি বিশ্বকাপে ছয়টি আলাদা আসরে গোল করার ইতিহাস গড়েছেন। বিশ্বকাপে তার গোল এখন ১০, আর প্রতিটি ম্যাচেই তিনি নিজের ইতিহাস নতুন করে লিখছেন।
অন্যদিকে ক্রোয়েশিয়া আবারও প্রমাণ করেছে তারা বড় টুর্নামেন্টের দল। গ্রুপে শুরুটা ছিল কঠিন—ইংল্যান্ডের কাছে ৪–২ হার। এরপর তারা ঘুরে দাঁড়ায় পানামাকে ১–০ এবং ঘানাকে ২–১ হারিয়ে। তিন ম্যাচে ৫ গোল করেছে, ৫ গোল হজম করেছে। সংখ্যায় ভারসাম্যহীন মনে হলেও খেলায় আছে অভিজ্ঞতার দৃঢ়তা। আর সেই অভিজ্ঞতার কেন্দ্র লুকা মদ্রিচ। ৪০ বছর বয়সেও তিনি দলের হৃদয়। এই বিশ্বকাপে এখনো গোল না পেলেও খেলার গতি, ছন্দ আর নিয়ন্ত্রণ তার পায়ের মাধ্যমেই তৈরি হয়। কখন গতি কমাতে হবে, কখন আক্রমণ বাড়াতে হবে—এই সিদ্ধান্তগুলোই ক্রোয়েশিয়াকে আলাদা করে। তার পাশে মার্টিন বাতুরিনা ও পেতার সুচিচের মতো তরুণরা শক্তি যোগ করছে, কিন্তু খেলার আত্মা এখনো মদ্রিচই।
এই ম্যাচের আসল লড়াই হবে মাঝমাঠে। পর্তুগাল চাইবে বল দখলে রেখে খেলা নিয়ন্ত্রণ করতে, ছোট ছোট পাসে সুযোগ তৈরি করতে। ব্রুনো ও ভিতিনিয়া সেই ছন্দ গড়ার দায়িত্বে থাকবে। অন্যদিকে ক্রোয়েশিয়া চাইবে সেই ছন্দ ভেঙে দিতে, মদ্রিচের অভিজ্ঞতা দিয়ে ম্যাচকে ধীর ও জটিল করে তুলতে। ক্রোয়েশিয়ার কোচ জ্লাতকো দালিচ বলেছেন, এটা শুধু রোনাল্ডো বনাম মদ্রিচ নয়, আসল লড়াই ভুল কম করার। নকআউট ফুটবলে এক মুহূর্তই ম্যাচের ভাগ্য বদলে দিতে পারে।
অতীতের ইতিহাসে দেখা যায় ইউরো ২০১৬–তে শেষ ষোলোতে পর্তুগাল অতিরিক্ত সময়ে জিতেছিল এবং পরে তারা চ্যাম্পিয়ন হয়েছিল। কিন্তু বিশ্বকাপে এই দুই দল আগে কখনো মুখোমুখি হয়নি, তাই ইতিহাস এখানে খুব বেশি কাজে লাগবে না। এখন সামনে শুধু বর্তমান। জয়ী দল অপেক্ষা করছে স্পেন বা অস্ট্রিয়ার বিপক্ষে নতুন চ্যালেঞ্জের জন্য। শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটা খুব সরল কিন্তু ভারী—এটা কি রোনাল্ডোর আরেকটি স্মরণীয় রাত হবে, নাকি মদ্রিচ লিখবেন আরেকটি নিঃশব্দ কিন্তু অবিস্মরণীয় বিদায়ী গল্প।
Leave a Reply