তিস্তা মহাপরিকল্পনার দ্রুত বাস্তবায়নের দাবিতে আবারও সোচ্চার হয়েছে তিস্তা অববাহিকার মানুষ। জাতীয় সংসদে প্রধানমন্ত্রীর তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের ঘোষণাকে স্বাগত জানিয়ে প্রকল্পটি দ্রুত জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটিতে (একনেক) অনুমোদন এবং বাস্তবায়নের নির্দিষ্ট সময়সূচি ঘোষণার দাবিতে গাইবান্ধাসহ তিস্তা তীরবর্তী পাঁচ জেলায় গণসমাবেশ ও আলোর মিছিল অনুষ্ঠিত হয়েছে।
বুধবার (১ জুলাই) সন্ধ্যায় তিস্তা বাঁচাও নদী বাঁচাও সংগ্রাম পরিষদের উদ্যোগে গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জ উপজেলার তারাপুর ইউনিয়নের আলীবাবা থিম পার্কসংলগ্ন তিস্তা নদীর তীরে কেন্দ্রীয় কর্মসূচির আয়োজন করা হয়। সমাবেশ শেষে সংগঠনের কেন্দ্রীয় সভাপতি নজরুল ইসলাম হক্কানীর নেতৃত্বে হাজারো মানুষ হাতে মশাল ও আলোর প্রদীপ নিয়ে বর্ণাঢ্য মিছিলে অংশ নেন। নদী রক্ষার দাবিতে স্লোগানে মুখর হয়ে ওঠে পুরো তিস্তা তীর।
শুধু গাইবান্ধাই নয়, একই সময়ে রংপুর, নীলফামারী, লালমনিরহাট ও কুড়িগ্রাম জেলার তিস্তা তীরবর্তী অন্তত আটটি স্থানে একযোগে একই কর্মসূচি পালন করা হয়। নীলফামারীর জলঢাকার শৈলমারী ও বানপাড়া, কুড়িগ্রামের রাজারহাটের বুড়িরহাট, উলিপুরের হোকোডাঙা, রংপুরের গঙ্গাচড়াসহ বিভিন্ন এলাকায় স্থানীয় বাসিন্দা, কৃষক, শিক্ষার্থী ও সামাজিক সংগঠনের প্রতিনিধিরা এতে অংশ নেন। ফলে কর্মসূচিটি তিস্তা অববাহিকার মানুষের সম্মিলিত দাবির প্রতীক হয়ে ওঠে।
সমাবেশে বক্তারা বলেন, প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণায় তিস্তা অঞ্চলের মানুষের মধ্যে নতুন আশার সঞ্চার হয়েছে। তবে শুধু ঘোষণা নয়, এখন প্রয়োজন দ্রুত একনেকের অনুমোদন, অর্থায়ন নিশ্চিত করা এবং বাস্তবায়নের সুস্পষ্ট রোডম্যাপ প্রকাশ করা। দীর্ঘদিন ধরে নদীভাঙন, শুষ্ক মৌসুমে পানির সংকট, বন্যা এবং জীবিকা হারানোর মতো সমস্যায় ভোগা মানুষের জন্য প্রকল্পটি আর বিলম্বিত করা উচিত নয় বলেও তারা মন্তব্য করেন।
সংগঠনের কেন্দ্রীয় সভাপতি নজরুল ইসলাম হক্কানী বলেন, তিস্তা মহাপরিকল্পনা শুধু একটি নদী উন্নয়ন প্রকল্প নয়; এটি উত্তরাঞ্চলের অর্থনীতি, কৃষি, পরিবেশ ও মানুষের জীবনমান পরিবর্তনের একটি সমন্বিত জাতীয় উদ্যোগ। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে নদীভাঙন নিয়ন্ত্রণ, তিস্তার নাব্যতা ফিরিয়ে আনা, সেচব্যবস্থার উন্নয়ন, কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি, পরিবেশ সংরক্ষণ, শিল্পায়ন এবং কর্মসংস্থানের নতুন সুযোগ সৃষ্টি হবে। একই সঙ্গে উত্তরাঞ্চলের দীর্ঘদিনের উন্নয়ন বৈষম্যও অনেকাংশে কমে আসবে।
সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক শফিয়ার রহমান বলেন, তিস্তা অববাহিকার লাখো মানুষ বছরের পর বছর এই প্রকল্পের অপেক্ষায় রয়েছে। তাই দ্রুত প্রশাসনিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে প্রকল্পের কাজ শুরুর জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানান তিনি।
সমাবেশে আরও বক্তব্য দেন সংগঠনের স্ট্যান্ডিং কমিটির সদস্য আব্দুর রাজ্জাক, কেন্দ্রীয় নেতা আলমগীর কবির, বাবুল আক্তার, আশিকুর রহমান, ববিউল ইসলাম, স্থানীয় সংগঠক আব্দুস ছাত্তার, জিয়াউর কামরুজ্জামান, রফিকুল ইসলাম এবং সংহতি প্রকাশ করেন প্রকৌশলী শেখ রেজওয়ান।
কর্মসূচি থেকে ছয় দফা দাবি তুলে ধরা হয়। দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে—তিস্তা মহাপরিকল্পনা দ্রুত একনেকে অনুমোদন ও বাস্তবায়নের নির্দিষ্ট সময়সূচি ঘোষণা, নদী প্রকৌশলী, জলবায়ু বিশেষজ্ঞ ও আন্দোলনের প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে স্বতন্ত্র ‘তিস্তা কর্তৃপক্ষ’ গঠন, দক্ষ ও অভিজ্ঞ প্রকল্প পরিচালক নিয়োগ, সরকারি ব্যবস্থাপনায় ‘তিস্তা বন্ড’ চালু করে অর্থায়ন নিশ্চিত করা, ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর ন্যায্য ক্ষতিপূরণ ও পুনর্বাসনের ব্যবস্থা এবং প্রকল্পের আওতায় পরিকল্পিত শিল্পাঞ্চল, কৃষি অঞ্চল, সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্র ও কৃষিভিত্তিক শিল্প গড়ে তোলা।
বক্তারা বলেন, তিস্তা শুধু একটি নদীর নাম নয়; এটি উত্তরাঞ্চলের কোটি মানুষের জীবন, জীবিকা ও অর্থনীতির সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। তাই প্রকল্পটি দ্রুত বাস্তবায়ন হলে শুধু নদী রক্ষা নয়, পুরো উত্তরাঞ্চলের টেকসই উন্নয়ন, খাদ্য নিরাপত্তা, কর্মসংস্থান এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হবে বলে তারা আশা প্রকাশ করেন।
Leave a Reply