আন্তর্জাতিক ডেস্ক
দক্ষিণ লেবাননে দীর্ঘদিনের সামরিক উপস্থিতি নিয়ে নতুন এক কূটনৈতিক বাস্তবতার মুখোমুখি হয়েছে ইসরাইল। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য চাপ এবং চলমান আঞ্চলিক কূটনৈতিক তৎপরতার প্রেক্ষাপটে অধিকৃত অঞ্চলগুলো থেকে ধাপে ধাপে সেনা প্রত্যাহারের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করছে তেল আবিব। ইসরাইলের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম ‘কান’-এর এক প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, দক্ষিণ লেবাননের নিরাপত্তা পরিস্থিতি এবং সেনা মোতায়েন নিয়ে নতুন দফার আলোচনায় বসতে যাচ্ছে ইসরাইল ও লেবানন। যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় অনুষ্ঠিতব্য এ আলোচনায় উভয় দেশের কূটনৈতিক প্রতিনিধিদের পাশাপাশি ইসরাইলি সামরিক বাহিনীর উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারাও অংশ নেবেন।
কূটনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, লেবাননের সেনাবাহিনীকে সীমান্তবর্তী অঞ্চলে পুনরায় কার্যকরভাবে মোতায়েন করার একটি পরীক্ষামূলক পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা চলছে। এ পরিকল্পনার অংশ হিসেবে নির্দিষ্ট কিছু এলাকা থেকে ইসরাইলি সেনা ধাপে ধাপে সরিয়ে নেওয়ার সম্ভাবনাও বিবেচনায় রয়েছে।
ইসরাইলি নিরাপত্তা মহলের একাধিক সূত্রের মতে, আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে এবং উত্তেজনা কমানোর লক্ষ্যে ওয়াশিংটন ‘বিশ্বাস তৈরির পদক্ষেপ’ হিসেবে সেনা প্রত্যাহারের বিষয়টি সামনে আনতে পারে। এ কারণে ইসরাইলি সেনাবাহিনী ইতোমধ্যে মাঠপর্যায়ে কিছু পুনর্বিন্যাস ও বিকল্প নিরাপত্তা পরিকল্পনা নিয়ে কাজ শুরু করেছে।
এদিকে লেবাননে যুদ্ধবিরতি পর্যবেক্ষণের জন্য একটি নতুন আন্তর্জাতিক তদারকি ব্যবস্থা গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এতে বিভিন্ন আঞ্চলিক পক্ষের অংশগ্রহণের কথা থাকলেও ইসরাইলের অনুপস্থিতি তেল আবিবে উদ্বেগ তৈরি করেছে। ইসরাইলি বিশ্লেষকদের মতে, এই প্রক্রিয়ায় তাদের বাইরে রাখা হলে সীমান্ত নিরাপত্তা ও কৌশলগত স্বার্থ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
সম্প্রতি ইসরাইলি সংবাদমাধ্যমগুলোতে প্রকাশিত প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র আগের তুলনায় লেবানন প্রশ্নে আরও কঠোর অবস্থান নিয়েছে। ওয়াশিংটনের বার্তা হলো, সীমান্ত এলাকায় অনির্দিষ্টকালের জন্য সামরিক অভিযান চালানোর সুযোগ আর আগের মতো থাকবে না। বরং রাজনৈতিক সমাধান এবং কূটনৈতিক উদ্যোগকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, দক্ষিণ লেবানন ইস্যু এখন শুধু ইসরাইল-লেবানন সীমান্তের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। এটি মধ্যপ্রাচ্যের বৃহত্তর ভূরাজনৈতিক সমীকরণের অংশ হয়ে উঠেছে। ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি, উপসাগরীয় অঞ্চলের নিরাপত্তা, জ্বালানি বাজারের স্থিতিশীলতা এবং যুক্তরাষ্ট্রের আঞ্চলিক কূটনৈতিক লক্ষ্য—সবকিছুর সঙ্গেই এই সংকট নিবিড়ভাবে জড়িত।
অন্যদিকে, ইসরাইলের রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা মহলের একটি অংশ আশঙ্কা করছে, দক্ষিণ লেবানন থেকে দ্রুত সেনা প্রত্যাহার করলে তা দুর্বলতার বার্তা হিসেবে দেখা হতে পারে। তাদের মতে, এতে হিজবুল্লাহ নিজেদের রাজনৈতিক ও সামরিক সাফল্য দাবি করার সুযোগ পাবে, যা ভবিষ্যতে সীমান্ত পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলতে পারে।
সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে অনুষ্ঠিত দীর্ঘ বৈঠকের পর লেবাননসহ বিভিন্ন আঞ্চলিক সংঘাত কমানোর বিষয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হওয়ায় বিষয়টি আরও গুরুত্ব পেয়েছে। কূটনৈতিক মহল মনে করছে, মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা কমাতে বৃহত্তর সমঝোতার অংশ হিসেবেই দক্ষিণ লেবানন প্রশ্নটি সামনে এসেছে।
লেবানন সরকারের তথ্য অনুযায়ী, চলমান সংঘাত ও সামরিক অভিযানের ফলে দেশটিতে কয়েক হাজার মানুষ প্রাণ হারিয়েছে, আহত হয়েছে বহু মানুষ এবং বাস্তুচ্যুত হয়েছে লাখো নাগরিক। মানবিক পরিস্থিতির অবনতি আন্তর্জাতিক মহলেও উদ্বেগ বাড়িয়েছে।
বর্তমানে দক্ষিণ লেবাননের বিভিন্ন কৌশলগত এলাকায় ইসরাইলি বাহিনীর উপস্থিতি রয়েছে। এর কিছু অঞ্চল বহু বছর ধরে তাদের নিয়ন্ত্রণে থাকলেও সাম্প্রতিক সংঘাতের সময় আরও কয়েকটি এলাকায় নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে তারা। এখন সেই উপস্থিতির ভবিষ্যৎ নিয়েই শুরু হয়েছে নতুন কূটনৈতিক হিসাব-নিকাশ।
Leave a Reply