ক্রীড়া ডেস্ক
ফুটবল কখনো কখনো এমন কিছু গল্প তৈরি করে, যা কল্পকাহিনীকেও হার মানায়। লিওনেল মেসি ও লামিন ইয়ামালের গল্প যেন তেমনই এক অবিশ্বাস্য অধ্যায়। ১৯ বছর আগে যে শিশুকে নিজের হাতে গোসল করিয়ে কোলে নিয়েছিলেন তরুণ মেসি, সময়ের স্রোতে সেই শিশুই আজ দাঁড়িয়ে গেছে মেসির সামনে—বিশ্বকাপের সবচেয়ে বড় মঞ্চে প্রতিপক্ষ হয়ে।

২০০৭ সালের সেই ঘটনা ছিল নিছক একটি দাতব্য কার্যক্রমের অংশ। তখন বার্সেলোনার তরুণ তারকা লিওনেল মেসি অংশ নিয়েছিলেন ইউনিসেফের সহযোগিতায় আয়োজিত একটি বিশেষ ফটোশুটে। কাতালান সংবাদমাধ্যম ‘দিয়ারিও স্পোর্ত’-এর উদ্যোগে করা ওই ক্যালেন্ডার প্রকল্পে বার্সেলোনা খেলোয়াড়দের সঙ্গে স্থানীয় শিশুদের যুক্ত করা হয়েছিল।
সেই ফটোশুটেই ভাগ্যক্রমে মেসির কোলে তুলে দেওয়া হয়েছিল মাত্র কয়েক মাস বয়সী এক শিশুকে। শিশুটির নাম ছিল লামিন ইয়ামাল। তখন মেসি নিজেও জানতেন না, তার কোলে থাকা এই ছোট্ট শিশুটি একদিন বিশ্ব ফুটবলের অন্যতম বড় তারকা হয়ে উঠবে।
সেই সময়ের ছবিগুলো দীর্ঘদিন লোকচক্ষুর আড়ালেই ছিল। পরে ২০২৪ সালে ইয়ামালের পরিবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছবিগুলো প্রকাশ করলে পুরো ফুটবল বিশ্বে তৈরি হয় বিস্ময়। ভক্তরা দেখতে পান—মেসির কোলে থাকা সেই শিশুই আজ বার্সেলোনা ও স্পেনের নতুন প্রজন্মের সবচেয়ে আলোচিত ফুটবলার।
লামিন ইয়ামালের উত্থান ছিল অবিশ্বাস্য। অল্প বয়সেই বার্সেলোনার মূল দলে জায়গা করে নিয়ে তিনি নিজের প্রতিভার জানান দেন। দুর্দান্ত ড্রিবলিং, অসাধারণ মাঠদৃষ্টি, গতি ও পরিণত ফুটবলীয় দক্ষতায় তিনি দ্রুতই বিশ্ব ফুটবলের অন্যতম বড় প্রতিভা হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন।
স্পেনের জার্সিতেও ইয়ামাল লিখেছেন নতুন ইতিহাস। বয়সের তুলনায় তার পরিণত পারফরম্যান্স ফুটবলপ্রেমীদের মুগ্ধ করেছে। অনেকেই তাকে ভবিষ্যতের বিশ্বসেরা খেলোয়াড়দের একজন হিসেবে দেখছেন।
অন্যদিকে লিওনেল মেসি দাঁড়িয়ে আছেন ক্যারিয়ারের শেষ অধ্যায়ে। বয়স বাড়লেও তার জাদু কমেনি। আর্জেন্টিনার অধিনায়ক এখনো বড় ম্যাচে পার্থক্য গড়ে দেওয়ার ক্ষমতা রাখেন।
বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে কঠিন পরিস্থিতিতে সেই মেসিকেই দেখা গেছে সামনে থেকে নেতৃত্ব দিতে। তার দুর্দান্ত দুটি অ্যাসিস্টে আর্জেন্টিনা ২-১ গোলের জয় তুলে নিয়ে টানা দ্বিতীয়বারের মতো বিশ্বকাপ ফাইনালে জায়গা করে নেয়।
এখন সেই ফাইনালে তৈরি হয়েছে এক বিরল দৃশ্য। এক পাশে লিওনেল মেসি—যিনি ক্যারিয়ারের শেষ প্রান্তে দাঁড়িয়ে আরও একটি বিশ্বকাপ ট্রফি জয়ের স্বপ্ন দেখছেন। অন্য পাশে লামিন ইয়ামাল—যিনি তরুণ বয়সেই নিজের প্রথম বিশ্বকাপ শিরোপার সন্ধানে মাঠে নামবেন।
একজন ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে বড় নামগুলোর একজন, আরেকজন নতুন যুগের সম্ভাব্য প্রতীক। কিন্তু তাদের গল্পকে যুক্ত করেছে ১৯ বছর আগের সেই ছোট্ট মুহূর্ত, যখন একজন কিংবদন্তি নিজের অজান্তেই ভবিষ্যতের এক তারকার সঙ্গে দেখা করেছিলেন।
বার্সেলোনার একটি দাতব্য ফটোশুট থেকে শুরু হওয়া সেই গল্প এখন এসে দাঁড়িয়েছে বিশ্বকাপ ফাইনালের মঞ্চে। যে শিশুকে একদিন মেসি কোলে নিয়েছিলেন, আজ সেই শিশুই তার সামনে শিরোপার লড়াইয়ে প্রতিপক্ষ।
ফুটবল ইতিহাসে এমন মুহূর্ত খুব কমই আসে, যেখানে অতীত ও ভবিষ্যৎ একই মাঠে মুখোমুখি দাঁড়ায়। এখন শুধু অপেক্ষা—বিশ্বকাপের মুকুট উঠবে অভিজ্ঞতার হাতে, নাকি নতুন প্রজন্মের স্বপ্ন পূরণ হবে।
Leave a Reply