ক্রীড়া ডেস্ক
২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপ লিওনেল মেসির ক্যারিয়ারে যেন আরেকটি ইতিহাসের অধ্যায় হয়ে উঠেছে। বয়স, অভিজ্ঞতা ও দীর্ঘ আন্তর্জাতিক পথচলাকে পেছনে ফেলে আর্জেন্টিনার অধিনায়ক এখনো বিশ্বমঞ্চে নিজের শ্রেষ্ঠত্বের প্রমাণ দিয়ে চলেছেন। একের পর এক রেকর্ড ভাঙার পর এবার তার সামনে রয়েছে আরও বড় এক চ্যালেঞ্জ—এক আসরে বিশ্বকাপের সর্বোচ্চ গোলের রেকর্ড নিজের করে নেওয়া।
নকআউট পর্বের লড়াই শেষে গোলদাতার তালিকায় সবার ওপরে রয়েছেন মেসি। মিশরের বিপক্ষে দুর্দান্ত ভলিতে গোল করে এবারের আসরে নিজের গোলসংখ্যা ৮-এ নিয়ে গেছেন আর্জেন্টাইন মহাতারকা। এই পারফরম্যান্স তাকে পৌঁছে দিয়েছে ফ্রান্সের কিংবদন্তি ফুটবলার জাস্ট ফন্টেইনের ঐতিহাসিক কীর্তির আরও কাছে।
১৯৫৮ সালের সুইডেন বিশ্বকাপে ফন্টেইন মাত্র এক আসরে ১৩ গোল করে যে অনন্য রেকর্ড গড়েছিলেন, তা গত ছয় দশকেরও বেশি সময় ধরে অক্ষত রয়েছে। সেই মাইলফলক ছুঁতে মেসির প্রয়োজন আরও পাঁচ গোল। আর্জেন্টিনা যদি কোয়ার্টার ফাইনাল পেরিয়ে সেমিফাইনাল ও ফাইনালে জায়গা করে নেয়, তাহলে সর্বোচ্চ তিনটি ম্যাচে সেই অসম্ভবকে সম্ভব করার সুযোগ পাবেন তিনি।
এবারের বিশ্বকাপে মেসির ধারাবাহিকতাও নজরকাড়া। এখন পর্যন্ত চার ম্যাচে আর্জেন্টিনার শুরুর একাদশে ছিলেন তিনি এবং প্রতিটি ম্যাচেই হয়েছেন সেরা খেলোয়াড়। তার গোল করার দক্ষতার পাশাপাশি নেতৃত্ব, সৃজনশীলতা ও ম্যাচ নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতাও দলকে এগিয়ে নিচ্ছে।
গোল্ডেন বুটের লড়াইয়ে মেসির সবচেয়ে বড় প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে রয়েছেন ফ্রান্সের কিলিয়ান এমবাপ্পে ও নরওয়ের আর্লিং হলান্ড। দুজনের ঝুলিতেই রয়েছে ৭টি করে গোল। ইংল্যান্ডের হ্যারি কেইনও পিছিয়ে নেই, তার গোলসংখ্যা ৬। ফলে ব্যক্তিগত সাফল্যের দৌড়ও এখন জমে উঠেছে।
তবে মেসির গোলসংখ্যা আরও বেশি হতে পারত। এবারের আসরে দুটি পেনাল্টি থেকে গোল করতে ব্যর্থ হয়েছেন তিনি। এর ফলে বিশ্বকাপ ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি পেনাল্টি মিস করা খেলোয়াড়ের তালিকাতেও নাম উঠেছে তার। ওই দুটি সুযোগ কাজে লাগাতে পারলে এখন পর্যন্ত তার গোলসংখ্যা হতে পারত ১০।
এবারের বিশ্বকাপে মেসির গোল এসেছে বিভিন্ন ম্যাচে গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে। আলজেরিয়ার বিপক্ষে হ্যাটট্রিক, অস্ট্রিয়ার বিপক্ষে জোড়া গোল এবং জর্ডান, কেপ ভার্দে ও মিশরের বিপক্ষে একটি করে গোল করে তিনি প্রমাণ করেছেন—বয়স নয়, পারফরম্যান্সই বড় বিষয়।
বিশ্বকাপের ইতিহাসে আরও একটি বিরল রেকর্ড নিজের করে নিয়েছেন মেসি। টানা ৯টি বিশ্বকাপ ম্যাচে গোল করার প্রথম ফুটবলার হয়েছেন তিনি। ২০২২ বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে অস্ট্রেলিয়া, নেদারল্যান্ডস, ক্রোয়েশিয়া ও ফ্রান্সের বিপক্ষে গোল করার পর ২০২৬ আসরে আলজেরিয়া, অস্ট্রিয়া, জর্ডান, কেপ ভার্দে ও মিশরের বিপক্ষেও গোল করে এই নজির গড়েছেন।
বিশ্বকাপের সামগ্রিক পরিসংখ্যানেও মেসি এখন অনন্য উচ্চতায়। ছয়টি বিশ্বকাপে অংশ নিয়ে তিনি খেলেছেন ৩১ ম্যাচ, যা টুর্নামেন্টের ইতিহাসে সর্বোচ্চ। তার বিশ্বকাপ গোলসংখ্যা ২১, যা আরেকটি নতুন রেকর্ড। ম্যাচ ও গোল—দুই বিভাগেই তিনি নিজেকে নিয়ে গেছেন কিংবদন্তিদের সারিতে।
তার পেছনে রয়েছেন কিলিয়ান এমবাপ্পে, যিনি তিনটি বিশ্বকাপে ১৯ ম্যাচ খেলে করেছেন ১৯ গোল। তবে মেসির অভিজ্ঞতা, দীর্ঘস্থায়ী সাফল্য এবং বড় ম্যাচে পারফর্ম করার ক্ষমতা তাকে আলাদা উচ্চতায় নিয়ে গেছে।
এখন ফুটবল বিশ্বের চোখ মেসির দিকে। ফন্টেইনের এক আসরে ১৩ গোলের রেকর্ড ভাঙতে পারলে বিশ্বকাপ ইতিহাসে নিজের নাম আরও বড় অক্ষরে লিখবেন আর্জেন্টাইন অধিনায়ক। আর সেই সঙ্গে আর্জেন্টিনার দ্বিতীয় বিশ্বকাপ শিরোপা ধরে রাখার স্বপ্নও পাবে নতুন গতি।
Leave a Reply