জেলা প্রতিনিধি
লক্ষ্মীপুরের রায়পুর পৌর শহরের ধানহাটা এলাকায় সংঘটিত মা ও তিন মেয়েকে নৃশংসভাবে হত্যার ঘটনায় নতুন নতুন তথ্য সামনে আসছে। ঘটনার সময় অভিযুক্ত অন্তর মজুমদার নিজেকে কল ও পাইপলাইনের মিস্ত্রি পরিচয় দিলেও তার আচরণে সন্দেহ হওয়ায় প্রতিবেশী আফরোজা বেগম দ্রুত পদক্ষেপ নেন। তার সেই তৎপরতার কারণেই অভিযুক্ত ঘটনাস্থল থেকে পালাতে পারেননি বলে স্থানীয়দের দাবি।
প্রতিবেশী আফরোজা বেগম জানান, বৃহস্পতিবার দুপুরে পাশের বাসা থেকে হঠাৎ “বাঁচাও, বাঁচাও” চিৎকার শুনে তিনি জানালার কাছে যান। কয়েকবার ডাকাডাকি করলেও ভেতর থেকে কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি। কিছুক্ষণ পর তিনি একজনকে ঘরের ভেতর চলাফেরা করতে দেখেন। প্রথমে তিনি ভেবেছিলেন, তিনি হয়তো পরিবারের ছেলে শিফাত। কিন্তু কোনো উত্তর না পাওয়ায় সন্দেহ আরও বাড়ে।
এরপর জানালা দিয়ে তিনি অভিযুক্তকে হাতে একটি প্যান্ট নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখেন। জানতে চাইলে ওই ব্যক্তি নিজেকে কল ও পাইপলাইনের মিস্ত্রি হিসেবে পরিচয় দেন। তবে পরিস্থিতি স্বাভাবিক মনে না হওয়ায় আফরোজা বেগম বাইরে থেকে বাসার দরজা আটকে দেন এবং আশপাশের মানুষকে খবর দেন।
স্থানীয়রা ঘটনাস্থলে পৌঁছে ঘরে ঢুকে মেঝেজুড়ে রক্তাক্ত অবস্থায় শাহিনুর বেগম ও তার তিন মেয়ের মরদেহ দেখতে পান। এ সময় অভিযুক্ত অন্তর মজুমদার পালানোর উদ্দেশ্যে ভবনের ছাদে উঠে যান। পরে স্থানীয়দের হাতে আটক হয়ে গণপিটুনির শিকার হন। গুরুতর আহত অবস্থায় পুলিশ তাকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে গেলে চিকিৎসাধীন অবস্থায় দুপুরে তার মৃত্যু হয়।
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্র জানিয়েছে, অন্তর মজুমদার নোয়াখালীর সুবর্ণচর উপজেলার দাসেরহাট এলাকার বাসিন্দা। রায়পুরে তিনি ভাসমান ফল বিক্রেতা হিসেবে জীবিকা নির্বাহ করতেন। স্থানীয়দের দাবি, অতীতে তিনি ‘জহির’ নামে মুসলিম পরিচয় ব্যবহার করে এক নারীকে নিয়ে একই এলাকায় প্রায় এক বছর বসবাস করেছিলেন। তবে এ বিষয়ে পুলিশ এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো মন্তব্য করেনি।
হত্যাকাণ্ডে নিহতরা হলেন শাহিনুর বেগম (৩৮), তার বড় মেয়ে সাইমা আক্তার (২০), মেজ মেয়ে ইকরা বেগম (১৭) এবং ছোট মেয়ে সিপা (৯)। সাইমা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ছিলেন এবং ইকরা রায়পুর কাজী ফারুকী কলেজের দ্বাদশ শ্রেণির ছাত্রী। দীর্ঘ প্রায় ২৫-২৬ বছর ধরে পরিবারটি রায়পুরে ভাড়া বাসায় বসবাস করছিল। তাদের গ্রামের বাড়ি কুমিল্লার হোমনা উপজেলায়। পরিবারের কর্তা কামাল হোসেন ২০১৯ সালে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে মারা যান। এরপর থেকে শাহিনুর বেগম সন্তানদের নিয়ে সংসার চালিয়ে আসছিলেন।
ঘটনার পর নিহতদের ছেলে জিহাদুল ইসলাম শিফাত বাদী হয়ে রায়পুর থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেছেন। অন্যদিকে, অভিযুক্তকে গণপিটুনির ঘটনায় এবং তাকে উদ্ধার করতে গিয়ে সাত পুলিশ সদস্য আহত হওয়ার অভিযোগে পুলিশের পক্ষ থেকেও পৃথক একটি মামলা করা হয়েছে। দুটি মামলারই তদন্ত করছে রায়পুর থানা পুলিশ।
রায়পুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শাহীন মিয়া জানিয়েছেন, ঘটনাস্থল থেকে হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত একটি ধারালো দা জব্দ করা হয়েছে। প্রাথমিক তদন্তে ধারণা করা হচ্ছে, একজন ব্যক্তি একাই হত্যাকাণ্ডটি ঘটিয়েছেন। তবে হত্যার উদ্দেশ্য বা এর পেছনে অন্য কোনো কারণ রয়েছে কি না, তা নিশ্চিত হতে পুলিশ, সিআইডি ও র্যাব যৌথভাবে তদন্ত চালিয়ে যাচ্ছে।
এদিকে এ নৃশংস হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদ এবং ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজু ভাস্কর্যের সামনে মানববন্ধন করেছেন লক্ষ্মীপুর জেলা ছাত্রছাত্রী কল্যাণ সমিতির সদস্যরা।
শনিবার সকালে লক্ষ্মীপুর-২ (রায়পুর) আসনের সংসদ সদস্য আবুল খায়ের ভুঁইয়া ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন। তিনি তদন্তকারী সংস্থাগুলোকে প্রকৃত ঘটনা উদঘাটনের নির্দেশ দেন। এর আগে চট্টগ্রাম বিভাগের ডিআইজি মনিরুজ্জামানও ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে তদন্তের অগ্রগতি পর্যবেক্ষণ করেন।
পুলিশ বলছে, হত্যার প্রকৃত উদ্দেশ্য উদঘাটনে একাধিক তদন্ত দল কাজ করছে। তদন্ত শেষ হওয়ার আগে এ ঘটনায় চূড়ান্ত কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সম্ভব নয়।
Leave a Reply