শিশু রামিসা হত্যা: জেল আপিলে দায় স্বীকার করে সোহেলের বক্তব্য
Reporter Name
Update Time :
Sunday, June 14, 2026
15 Time View
তিস্তা টিভি ডেস্ক
রাজধানীর পল্লবীতে আলোচিত শিশু রামিসা আক্তার ধর্ষণ ও হত্যা মামলার মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত প্রধান আসামি সোহেল রানা জেল আপিলে নিজের অপরাধ স্বীকার করে আদালতের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করেছেন। একই সঙ্গে তিনি দাবি করেছেন, আর্থিক সংকট, পারিবারিক অশান্তি এবং দীর্ঘদিনের মাদকাসক্তির কারণে তিনি মানসিক ভারসাম্যহীন অবস্থায় অপরাধটি ঘটিয়েছেন। অন্যদিকে, একই মামলায় মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত তার স্ত্রী স্বপ্না আক্তার নিজেকে নির্দোষ দাবি করে খালাস চেয়েছেন।
রোববার (১৪ জুন) বিচারপতি মোহাম্মদ আলী-এর নেতৃত্বাধীন হাইকোর্ট বেঞ্চ আসামি দুজনের জেল আপিল শুনানির জন্য গ্রহণ করেন। এর ফলে বহুল আলোচিত এই মামলাটি এখন আপিল পর্যায়ে প্রবেশ করেছে।
জেল আপিলে সোহেল রানা উল্লেখ করেন, তিনি পেশায় একটি অটোরিকশা গ্যারেজের মিস্ত্রি ছিলেন এবং দীর্ঘদিন ধরে মাদকাসক্ত ছিলেন। নিয়মিত মাদক গ্রহণের কারণে পরিবারে অশান্তি ও কলহ লেগেই থাকত। তিনি আদালতকে বলেন, এর আগে কখনও কোনো অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িত ছিলেন না। ভিকটিমের সঙ্গে ঘটে যাওয়া ঘটনাটি মাদকাসক্ত ও নেশাগ্রস্ত অবস্থায় ঘটেছে বলে দাবি করেন তিনি।
আপিলে সোহেল আরও বলেন, আর্থিক অনটন, পারিবারিক চাপ এবং নেশাগ্রস্ততার কারণে তিনি পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করতে পারেননি। নিজের একমাত্র সন্তানের ভবিষ্যৎ ও পরিবারের অসহায় অবস্থার কথা উল্লেখ করে তিনি আদালতের কাছে দয়া প্রার্থনা করেন। তিনি বলেন, “আমি ভুল করেছি, আমি আমার অপরাধের জন্য অনুতপ্ত। আদালতের কাছে ক্ষমা চাই।”
অন্যদিকে, তার স্ত্রী স্বপ্না আক্তার জেল আপিলে দাবি করেন, তিনি কোনোভাবেই হত্যাকাণ্ডে জড়িত ছিলেন না। মামলায় তাকে অন্যায়ভাবে ফাঁসানো হয়েছে বলে উল্লেখ করে তিনি খালাসের আবেদন জানান।
মামলার নথি অনুযায়ী, গত ১১ জুন কারা কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে হাইকোর্টে জেল আপিল দায়ের করেন দুই আসামি। পরে আদালত তা শুনানির জন্য গ্রহণ করেন।
আলোচিত এ হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটে গত ১৯ মে সকালে রাজধানীর পল্লবী এলাকায়। দ্বিতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী রামিসা আক্তার ওইদিন সকালে বাসা থেকে বের হওয়ার পর নিখোঁজ হয়। পরে তাকে খুঁজতে গিয়ে পরিবারের সদস্যরা পাশের বাসার দরজা ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করলে ভয়াবহ দৃশ্যের মুখোমুখি হন। সেখান থেকে শিশুটির মস্তকবিহীন মরদেহ উদ্ধার করা হয়। একই কক্ষের একটি বড় বালতির ভেতর পাওয়া যায় তার বিচ্ছিন্ন মাথা।
ঘটনার পর দেশজুড়ে ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়। জরুরি সেবা ৯৯৯-এ খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে স্বপ্না আক্তারকে হেফাজতে নেয়। পরে তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় রাজধানী ছেড়ে পালিয়ে যাওয়া সোহেল রানাকে ফতুল্লা এলাকা থেকে গ্রেপ্তার করা হয়।
তদন্তে দ্রুত অগ্রগতি এনে পুলিশ মাত্র চার দিনের মধ্যে অভিযোগপত্র দাখিল করে। তদন্তকারী কর্মকর্তা উপ-পরিদর্শক অহিদুজ্জামান ২৪ মে আদালতে চার্জশিট জমা দেন। অভিযোগপত্রে ১৮ জন সাক্ষীর নাম অন্তর্ভুক্ত করা হয়।
এরপর ১ জুন আদালত আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করে বিচার শুরুর নির্দেশ দেন। ২ জুন শুরু হয় সাক্ষ্যগ্রহণ। দ্রুত বিচার প্রক্রিয়ায় একদিনেই অধিকাংশ সাক্ষীর সাক্ষ্য গ্রহণ সম্পন্ন হয়। ৩ জুন আত্মপক্ষ সমর্থনের শুনানিতে নিজেদের নির্দোষ দাবি করেন আসামিরা। ৪ জুন উভয় পক্ষের যুক্তিতর্ক শেষে আদালত রায়ের জন্য ৭ জুন দিন ধার্য করেন।
পরবর্তীতে ৭ জুন ঢাকার শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক মাসরুর সালেকীন রায় ঘোষণা করেন। রায়ে সোহেল রানা ও স্বপ্না আক্তারকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। আদালত তার পর্যবেক্ষণে উল্লেখ করেন, শিশুটিকে হত্যার আগে ধর্ষণ ও শারীরিক নির্যাতনের সুস্পষ্ট প্রমাণ পাওয়া গেছে। পাশাপাশি সোহেলের স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি এবং ঘটনার পারিপার্শ্বিক আলামত তার অপরাধকে সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ করেছে।
বর্তমানে মামলাটি হাইকোর্টে আপিল শুনানির অপেক্ষায় রয়েছে। আলোচিত এই মামলার পরবর্তী আইনগত অগ্রগতি নিয়ে দেশজুড়ে ব্যাপক আগ্রহ তৈরি হয়েছে।
Leave a Reply