তিস্তা টিভি ডেস্ক
দুর্নীতি, অর্থপাচার ও ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগে একাধিক মামলার আসামি বাংলাদেশ পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বেনজীর আহমেদ সংযুক্ত আরব আমিরাতে গ্রেপ্তার হয়েছেন বলে জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। দীর্ঘদিন ধরে দেশের বাইরে অবস্থানরত এই সাবেক পুলিশ কর্মকর্তাকে দেশে ফিরিয়ে আনতে সরকার আনুষ্ঠানিক প্রত্যর্পণ (এক্সট্রাডিশন) প্রক্রিয়া শুরু করেছে বলেও তিনি জানিয়েছেন।
রোববার (১৪ জুন) জাতীয় সংসদে এক প্রশ্নের জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এ তথ্য জানান। তিনি বলেন, গত ১২ জুন সংযুক্ত আরব আমিরাতের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধীন ডাইরেক্টরেট জেনারেল অব ফেডারেল ক্রিমিনাল পুলিশ এবং ন্যাশনাল সেন্ট্রাল ব্যুরো (এনসিবি) আবুধাবি থেকে বাংলাদেশ সরকারকে পাঠানো এক ই-মেইলে বেনজীর আহমেদের গ্রেপ্তারের বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে অবহিত করা হয়। বর্তমানে তিনি দেশটির আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হেফাজতে রয়েছেন।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, আন্তর্জাতিক আইন ও দুই দেশের বিদ্যমান কূটনৈতিক প্রক্রিয়া অনুসারে গ্রেপ্তারের ৩০ দিনের মধ্যে আনুষ্ঠানিক প্রত্যর্পণ আবেদন জমা দিতে হয়। এ লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় নথিপত্র প্রস্তুতের কাজ ইতোমধ্যে সম্পন্ন হয়েছে এবং সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলো সমন্বিতভাবে কাজ করছে।
তিনি বলেন, “দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) দায়ের করা মামলা, গ্রেপ্তারি পরোয়ানা, তদন্ত প্রতিবেদন এবং অন্যান্য আইনগত দলিল সংগ্রহ করে প্রত্যর্পণ প্রস্তাব প্রস্তুত করা হয়েছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় তা অনুমোদন দিয়েছে এবং পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে সংযুক্ত আরব আমিরাত কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানোর কার্যক্রম চলছে। আশা করছি, আইনগত প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার পর দ্রুতই তাকে দেশে ফিরিয়ে আনা সম্ভব হবে।”
মন্ত্রী আরও জানান, বেনজীর আহমেদের বিরুদ্ধে দণ্ডবিধির বিভিন্ন ধারায় জালিয়াতি, প্রতারণা, জাল কাগজপত্র ব্যবহার ও অপরাধে সহায়তার অভিযোগ রয়েছে। পাশাপাশি দুর্নীতি প্রতিরোধ আইন, মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইন এবং পাসপোর্ট আইনের বিভিন্ন ধারায় তার বিরুদ্ধে মামলা বিচারাধীন রয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, বেনজীর আহমেদের বিরুদ্ধে বিপুল পরিমাণ অবৈধ সম্পদ অর্জন, বিদেশে অর্থ পাচার, বেনামি সম্পদ গঠন এবং ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগে তদন্ত শুরু হওয়ার পর তিনি দেশত্যাগ করেন। পরে আদালতের নির্দেশে তার ও পরিবারের সদস্যদের বিপুল পরিমাণ স্থাবর-অস্থাবর সম্পদ জব্দ করা হয় এবং ব্যাংক হিসাবও ফ্রিজ করা হয়।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সংসদে বলেন, বর্তমান সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর বেনজীর আহমেদকে আইনের আওতায় আনতে পুলিশের ন্যাশনাল সেন্ট্রাল ব্যুরো (এনসিবি) ঢাকা ইন্টারপোলের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করে। এরই ধারাবাহিকতায় ২০২৫ সালের ১১ এপ্রিল ইন্টারপোল তার বিরুদ্ধে ‘রেড নোটিশ’ জারি করে, যা আন্তর্জাতিক পর্যায়ে তাকে গ্রেপ্তারের পথ সুগম করে।
তিনি এ ঘটনাকে বাংলাদেশ পুলিশের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্জন হিসেবে উল্লেখ করে বলেন, “এটি শুধু একজন ব্যক্তিকে গ্রেপ্তারের ঘটনা নয়; বরং আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে একটি শক্তিশালী বার্তা। অপরাধী যত প্রভাবশালী বা ক্ষমতাবানই হোক না কেন, আইনের হাত থেকে কেউ রেহাই পাবে না।”
আইন ও প্রশাসন সংশ্লিষ্ট মহল মনে করছে, বেনজীর আহমেদের গ্রেপ্তার এবং তাকে দেশে ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ বাংলাদেশের বিচারব্যবস্থা ও দুর্নীতিবিরোধী অভিযানের ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হবে। এখন সবার নজর প্রত্যর্পণ প্রক্রিয়া কত দ্রুত সম্পন্ন হয় এবং দেশে ফিরে তিনি বিচারিক কার্যক্রমের মুখোমুখি হন কি না, সেদিকে।
Leave a Reply