মোঃ মোনাব্বেরুল হক, জলঢাকা (নীলফামারী):
নীলফামারীর জলঢাকা উপজেলায় বাল্যবিবাহ প্রতিরোধে জনসচেতনতা বৃদ্ধি, আইন বাস্তবায়ন এবং সামাজিক প্রতিরোধ ব্যবস্থা আরও শক্তিশালী করার লক্ষ্যে উপজেলা বাল্যবিবাহ নিরোধ কমিটির ত্রৈমাসিক সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। রবিবার (৮ জুন) উপজেলা পরিষদ সম্মেলন কক্ষে আয়োজিত এ সভায় উপজেলার বিভিন্ন দপ্তরের কর্মকর্তা, জনপ্রতিনিধি, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান প্রধান, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য এবং সামাজিক সংগঠনের প্রতিনিধিরা অংশগ্রহণ করেন।
সভায় সভাপতিত্ব করেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) জান্নাতুল ফেরদৌস হ্যাপি। তিনি তাঁর বক্তব্যে বলেন, বাল্যবিবাহ একটি বহুমাত্রিক সামাজিক সমস্যা, যা কেবল একটি কিশোরীর ব্যক্তিগত জীবনকেই ক্ষতিগ্রস্ত করে না; বরং শিক্ষা, স্বাস্থ্য, অর্থনৈতিক উন্নয়ন এবং নারীর ক্ষমতায়নের পথেও বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়।
ইউএনও বলেন, “বাল্যবিবাহ প্রতিরোধে আইন প্রয়োগের পাশাপাশি সামাজিক সচেতনতা গড়ে তোলা অত্যন্ত জরুরি। বিশেষ করে স্কুল ও কলেজ পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের মধ্যে বাল্যবিবাহের কুফল সম্পর্কে সচেতনতা সৃষ্টি করতে হবে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে নিয়মিত আলোচনা সভা, সেমিনার, বিতর্ক প্রতিযোগিতা, ক্যাম্পেইন এবং অভিভাবক সমাবেশ আয়োজনের মাধ্যমে সচেতনতা কার্যক্রম আরও সম্প্রসারণ করা প্রয়োজন।”
তিনি আরও বলেন, শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি অভিভাবকদেরও বাল্যবিবাহের নেতিবাচক প্রভাব সম্পর্কে অবহিত করতে হবে। অনেক ক্ষেত্রে সামাজিক চাপ, দারিদ্র্য ও সচেতনতার অভাব বাল্যবিবাহের অন্যতম কারণ হিসেবে কাজ করে। এসব সমস্যা মোকাবিলায় প্রশাসন, শিক্ষক, জনপ্রতিনিধি, ধর্মীয় নেতা এবং স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিদের সম্মিলিতভাবে কাজ করতে হবে।
সভায় বক্তব্য দেন জলঢাকা থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মো. নাজমুল আলম। তিনি বলেন, “বাল্যবিবাহ একটি সামাজিক ব্যাধি, যা একটি মেয়ের শিক্ষা জীবন ব্যাহত করে, স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ায় এবং তার স্বাভাবিক বিকাশকে বাধাগ্রস্ত করে। এ ধরনের অপরাধ প্রতিরোধে শুধু আইন প্রয়োগই যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন সামাজিক প্রতিরোধ ও জনসম্পৃক্ততা।”
তিনি আরও বলেন, বিবাহ নিবন্ধক, জন্মনিবন্ধন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা, জনপ্রতিনিধি এবং স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তিরা যদি দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করেন, তাহলে বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ অনেক সহজ হবে। কোনো বাল্যবিবাহের তথ্য পাওয়া গেলে দ্রুত প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে অবহিত করার আহ্বান জানান তিনি।
সভায় অংশগ্রহণকারীরা উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় বাল্যবিবাহের বর্তমান পরিস্থিতি, প্রতিরোধমূলক উদ্যোগ এবং ভবিষ্যৎ করণীয় বিষয়ে মতামত তুলে ধরেন। বক্তারা বলেন, বাল্যবিবাহ রোধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের পাশাপাশি পরিবার ও সমাজভিত্তিক সচেতনতা কার্যক্রম বাড়াতে হবে। বিশেষ করে কিশোর-কিশোরীদের শিক্ষা অব্যাহত রাখা, তাদের দক্ষতা উন্নয়ন এবং আত্মবিশ্বাস বৃদ্ধির মাধ্যমে বাল্যবিবাহের ঝুঁকি অনেকাংশে কমানো সম্ভব।
সভায় উপজেলা প্রশাসনের বিভিন্ন দপ্তরের কর্মকর্তা, মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তরের প্রতিনিধি, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রধান, ইউনিয়ন পরিষদের জনপ্রতিনিধি এবং বিভিন্ন সামাজিক ও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।
সভা শেষে বাল্যবিবাহমুক্ত জলঢাকা গড়ে তোলার লক্ষ্যে সকলকে নিজ নিজ অবস্থান থেকে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালনের আহ্বান জানানো হয় এবং সচেতনতামূলক কার্যক্রম আরও জোরদার করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়।
Leave a Reply