আন্তর্জাতিক ডেস্ক
নতুন অস্ত্রমানের (weapon-grade) পারমাণবিক উপাদান উৎপাদন কেন্দ্র পরিদর্শনের পর উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম জং উন ঘোষণা দিয়েছেন, দেশের পারমাণবিক সক্ষমতা এখন থেকে ‘জ্যামিতিক হারে’ বৃদ্ধি করা হবে। রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম Korean Central News Agency (KCNA) বৃহস্পতিবার এ তথ্য প্রকাশ করে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, কিম জং উন দাবি করেছেন গত পাঁচ বছরে উত্তর কোরিয়া অস্ত্রমানের পারমাণবিক উপাদান উৎপাদনের সক্ষমতা একাধিক গুণ বৃদ্ধি করেছে। তাঁর ভাষায়, নতুন স্থাপনাটি দেশের পারমাণবিক প্রতিরোধক্ষমতাকে আরও শক্তিশালী করবে এবং দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত লক্ষ্য অর্জনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
উত্তর কোরিয়ার এই কর্মসূচি মূলত পাঁচ বছর মেয়াদি পরিকল্পনার অংশ, যা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ব্যর্থ নিরস্ত্রীকরণ আলোচনার পর আরও জোরদার করা হয়। এর আগে যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদে কিমের সঙ্গে তিন দফা শীর্ষ বৈঠক হলেও কোনো কার্যকর পারমাণবিক চুক্তি হয়নি।
KCNA জানায়, কিম যে স্থাপনাটি পরিদর্শন করেছেন তা উন্নত প্রযুক্তিসম্পন্ন ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ বা অস্ত্র উপাদান উৎপাদন কেন্দ্র। তবে এর অবস্থান প্রকাশ করা হয়নি। ফলে এটি ইয়ংবিয়ন অঞ্চলের নতুন কেন্দ্র কি না, নাকি অজানা অন্য কোনো স্থাপনা—তা নিশ্চিত নয়।
চলতি বছরের মার্চে যুক্তরাষ্ট্রের Congressional Research Service-এর এক প্রতিবেদনে বলা হয়, উত্তর কোরিয়ার কাছে বর্তমানে প্রায় ৯০টি পারমাণবিক ওয়ারহেড তৈরির উপযোগী উপাদান থাকতে পারে, যার মধ্যে প্রায় ৫০টি ইতোমধ্যে প্রস্তুত করা হয়েছে বলে ধারণা করা হয়।
অন্যদিকে International Atomic Energy Agency (IAEA) জানিয়েছে, দেশটিতে অন্তত দুটি সক্রিয় ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কেন্দ্র রয়েছে—ইয়ংবিয়ন ও কাংসন। সংস্থাটি ইয়ংবিয়নে একটি নতুন ভবন নির্মাণ পর্যবেক্ষণ করছে, যার কাঠামো কাংসনের কেন্দ্রের সঙ্গে মিল রয়েছে।
IAEA-এর পর্যবেক্ষণে বলা হয়, নতুন ভবনের বাইরের নির্মাণ শেষ পর্যায়ে এবং ভেতরের যন্ত্রপাতি স্থাপন চলছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকদের মতে, ইয়ংবিয়নে আরেকটি সমৃদ্ধকরণ ইউনিট গড়ে উঠতে পারে।
Korea Institute for National Unification-এর গবেষক হং মিন মনে করেন, উত্তর কোরিয়ার পারমাণবিক কর্মসূচি এখন গবেষণা পর্যায় থেকে সরে গিয়ে সরাসরি ‘গণউৎপাদন ও অস্ত্রায়ন’ পর্যায়ে প্রবেশ করছে। তার মতে, নতুন স্থাপনা দেশের প্রযুক্তিগত সক্ষমতার একটি সুস্পষ্ট বার্তা।
বিশ্লেষকদের মতে, বড় ধরনের ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা বা সামরিক কুচকাওয়াজের পরিবর্তে এখন উৎপাদন কেন্দ্রগুলোর প্রদর্শনকে গুরুত্ব দিচ্ছে পিয়ংইয়ং। এর মাধ্যমে তারা দেখাতে চাইছে যে, কৌশলগত পারমাণবিক শক্তি গড়ে তোলার পূর্ণ সক্ষমতা তাদের রয়েছে।
গত কয়েক বছরে উত্তর কোরিয়া একাধিক আন্তমহাদেশীয় ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র (ICBM) পরীক্ষা চালিয়েছে, যা যুক্তরাষ্ট্রের যেকোনো অঞ্চলে আঘাত হানতে সক্ষম বলে ধারণা করা হয়।
এদিকে ‘Nuclear Weapons Ban Monitor 2026’ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিশ্বে পারমাণবিক অস্ত্রভাণ্ডার আবারও বৃদ্ধি পাচ্ছে। বর্তমানে নয়টি পারমাণবিক শক্তিধর দেশের সক্রিয় ও মোতায়েনযোগ্য ওয়ারহেডের সংখ্যা প্রায় ৯ হাজার ৭৪৫টি।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, এসব অস্ত্রের মোট বিস্ফোরণ ক্ষমতা হিরোশিমায় ব্যবহৃত পারমাণবিক বোমার প্রায় ১ লাখ ৩৫ হাজার গুণ সমতুল্য। ২০২৫ সাল ছিল টানা নবম বছর, যখন মোতায়েনযোগ্য পারমাণবিক অস্ত্রের সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে।
বর্তমানে সবচেয়ে বড় পারমাণবিক ভাণ্ডার রয়েছে রাশিয়ার কাছে (৫ হাজার ৪০০-এর বেশি), দ্বিতীয় অবস্থানে যুক্তরাষ্ট্র (প্রায় ৫ হাজার ৩০০টি)।
কিম জং উন পারমাণবিক বিজ্ঞানীদের প্রশংসা করে বলেন, পাঁচ বছর মেয়াদি লক্ষ্য সফলভাবে অর্জিত হয়েছে। তাঁর দাবি, উত্তর কোরিয়ার পারমাণবিক সক্ষমতা এখন ‘কল্পনারও বাইরে’ পৌঁছে গেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই ঘোষণা কেবল সামরিক সক্ষমতার প্রদর্শন নয়, বরং আন্তর্জাতিক কূটনীতির ওপর চাপ তৈরির একটি কৌশলগত বার্তাও বটে—যেখানে পিয়ংইয়ং স্পষ্টভাবে জানাচ্ছে যে তাদের পারমাণবিক অগ্রগতি থেমে নেই, বরং আরও বিস্তৃত হচ্ছে।
Leave a Reply