আন্তর্জাতিক ডেস্ক
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান উত্তেজনার মধ্যেই এবার ইরানের ছোড়া ১০টি ক্ষেপণাস্ত্র আকাশেই ধ্বংস (ইন্টারসেপ্ট) করার দাবি করেছে জর্ডান। দেশটির সশস্ত্র বাহিনী জানিয়েছে, শনিবার (১৮ জুলাই) ভোরে জর্ডানের আকাশসীমার দিকে ধেয়ে আসা ক্ষেপণাস্ত্রগুলো অত্যাধুনিক আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার মাধ্যমে সফলভাবে প্রতিহত করা হয়েছে। এ ঘটনায় কোনো প্রাণহানি বা সম্পদের ক্ষয়ক্ষতি হয়নি বলেও দাবি করেছে আম্মান।
জর্ডানের রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থায় প্রকাশিত এক বিবৃতিতে দেশটির সশস্ত্র বাহিনীর জেনারেল কমান্ডের এক সামরিক কর্মকর্তা বলেন, দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষা, আকাশসীমার নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং সাধারণ নাগরিকদের সুরক্ষার স্বার্থেই প্রতিরক্ষামূলক অভিযানের অংশ হিসেবে ক্ষেপণাস্ত্রগুলো ধ্বংস করা হয়েছে। তিনি জোর দিয়ে বলেন, জর্ডানের আকাশসীমা লঙ্ঘনের যেকোনো চেষ্টা কঠোরভাবে প্রতিহত করা হবে।
সামরিক বাহিনী আরও জানায়, ক্ষেপণাস্ত্র ধ্বংসের পর সেগুলোর ধ্বংসাবশেষ দেশের বিভিন্ন এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে। এসব ধ্বংসাবশেষ নিরাপদে অপসারণ এবং সম্ভাব্য ঝুঁকি এড়াতে ‘রয়্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং কোর’-এর বিশেষজ্ঞ দল ঘটনাস্থলে কাজ শুরু করেছে। আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা মান ও কারিগরি প্রোটোকল অনুসরণ করে এলাকাগুলো নিরাপদ করা হচ্ছে।
এর আগে শুক্রবার ইরান দাবি করে, যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতির জবাবে তারা কুয়েত, ওমান, সিরিয়া, জর্ডান ও বাহরাইনে থাকা মার্কিন সামরিক স্থাপনাগুলো লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে। তেহরানের দাবি অনুযায়ী, এসব হামলায় একাধিক বিমানঘাঁটি, রাডার ব্যবস্থা, অস্ত্রের গুদাম এবং সামরিক উড়োজাহাজ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তবে যুক্তরাষ্ট্র কিংবা সংশ্লিষ্ট দেশগুলো এখন পর্যন্ত এসব দাবির স্বাধীনভাবে নিশ্চিত হওয়া কোনো তথ্য প্রকাশ করেনি।
অন্যদিকে জর্ডান, কুয়েত ও বাহরাইন জানিয়েছে, তাদের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ইরানের ছোড়া একাধিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন সফলভাবে প্রতিহত করেছে। একই ধরনের দাবি করেছে কাতারও। দেশটির কর্তৃপক্ষ জানায়, আকাশপথে আসা কয়েকটি হামলা নস্যাৎ করা হলেও ধ্বংস হওয়া ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোনের ধ্বংসাবশেষ (শ্র্যাপনেল) পড়ে এক শিশু আহত হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, সাম্প্রতিক সংঘাত কেবল ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই; বরং গোটা উপসাগরীয় অঞ্চলের নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে। যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ঘাঁটি থাকা দেশগুলো এখন সরাসরি সংঘাতের ঝুঁকির মুখে পড়েছে। ফলে আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা জোরদার করার পাশাপাশি নিরাপত্তা সতর্কতাও বাড়িয়েছে এসব দেশ।
প্রসঙ্গত, চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে ইরানকে লক্ষ্য করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সামরিক অভিযান শুরুর পর থেকেই মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা দ্রুত বৃদ্ধি পায়। এর প্রতিক্রিয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতি থাকা বিভিন্ন উপসাগরীয় দেশে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়ে আসছে তেহরান।
যদিও গত মাসে পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র একটি সমঝোতা স্মারকে স্বাক্ষর করেছিল এবং যুদ্ধবিরতি ও দীর্ঘমেয়াদি শান্তি প্রতিষ্ঠার বিষয়ে আশাবাদ তৈরি হয়েছিল, তবে হরমুজ প্রণালি ঘিরে নতুন করে উত্তেজনা দেখা দেওয়ার পর সেই উদ্যোগ কার্যত ভেস্তে যায়। এরপর থেকেই উভয় পক্ষ পাল্টাপাল্টি হামলা চালিয়ে যাচ্ছে, যা পুরো মধ্যপ্রাচ্যকে আবারও অনিশ্চয়তা ও নিরাপত্তা সংকটের মুখে ঠেলে দিয়েছে।
আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের আশঙ্কা, বর্তমান পরিস্থিতি দ্রুত নিয়ন্ত্রণে না এলে এই সংঘাত আরও বিস্তৃত আকার ধারণ করতে পারে, যার প্রভাব শুধু মধ্যপ্রাচ্যেই নয়, বৈশ্বিক জ্বালানি বাজার, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তার ওপরও পড়তে পারে।
Leave a Reply