আন্তর্জাতিক ডেস্ক
সৌদি আরবকে নিজস্ব ভূখণ্ডে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের সুযোগ দিতে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে একটি পারমাণবিক সহযোগিতা চুক্তির খসড়া তৈরি হয়েছে। তবে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের চূড়ান্ত অনুমোদন ও স্বাক্ষর না পাওয়ায় চুক্তিটি এখনো কার্যকর হয়নি।
আন্তর্জাতিক অঙ্গনে এই সম্ভাব্য চুক্তি নিয়ে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়েছে। কারণ ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ প্রযুক্তি একদিকে যেমন বেসামরিক পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদনে ব্যবহৃত হয়, অন্যদিকে উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ করা হলে তা পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
জানা গেছে, চুক্তির বিষয়ে আলোচনা কয়েক মাস আগে শেষ হলেও আঞ্চলিক উত্তেজনা, বিশেষ করে ইরানকে ঘিরে চলমান পরিস্থিতি এবং মার্কিন কংগ্রেসে সম্ভাব্য বিরোধিতার আশঙ্কায় চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে দেরি হচ্ছে।
সাধারণত পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য প্রয়োজনীয় ইউরেনিয়াম অনেক দেশ আন্তর্জাতিক বাজার থেকে সংগ্রহ করে। কিন্তু সৌদি আরব দীর্ঘদিন ধরে নিজস্ব পারমাণবিক জ্বালানি সক্ষমতা গড়ে তোলার আগ্রহ প্রকাশ করে আসছে। দেশটির দাবি, তাদের লক্ষ্য শান্তিপূর্ণ কাজে পারমাণবিক প্রযুক্তির ব্যবহার, বিশেষ করে বিদ্যুৎ উৎপাদন ও জ্বালানি খাতে সক্ষমতা বাড়ানো।
তবে বিশেষজ্ঞদের একটি অংশ এই চুক্তি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তাদের আশঙ্কা, কঠোর আন্তর্জাতিক নিয়ন্ত্রণ ছাড়া সৌদি আরবকে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের সুযোগ দেওয়া হলে ভবিষ্যতে এই প্রযুক্তির সামরিক ব্যবহারের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
এই উদ্বেগের পেছনে রয়েছে সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের আগের একটি বক্তব্য। তিনি বলেছিলেন, ইরান যদি পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করে, তাহলে সৌদি আরবও একই পথে যেতে পারে। যদিও রিয়াদ বরাবরই বলে আসছে, তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি সম্পূর্ণ শান্তিপূর্ণ উদ্দেশ্যে পরিচালিত হবে।
আরেকটি বড় প্রশ্ন হলো আন্তর্জাতিক নজরদারি। সমালোচকদের দাবি, সম্ভাব্য এই চুক্তিতে জাতিসংঘের পারমাণবিক নজরদারি সংস্থা আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থা বা আইএইএ-এর ভূমিকা কতটা থাকবে, সেটি পরিষ্কার নয়। পর্যাপ্ত নজরদারি না থাকলে ভবিষ্যতে স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে।
এর আগে ২০০৯ সালে সংযুক্ত আরব আমিরাত যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে পারমাণবিক সহযোগিতা চুক্তিতে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ ও পুনঃপ্রক্রিয়াজাতকরণের অধিকার ত্যাগ করেছিল। কঠোর আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা মানদণ্ড মেনে করা ওই চুক্তি ‘গোল্ড স্ট্যান্ডার্ড’ হিসেবে পরিচিতি পায়।
অন্যদিকে, চুক্তির সমর্থকদের যুক্তি হলো, সৌদি আরবের সঙ্গে পারমাণবিক সহযোগিতা বাড়ানো যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত ও অর্থনৈতিক স্বার্থের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। এর মাধ্যমে মার্কিন পারমাণবিক শিল্প বড় ধরনের বাণিজ্যিক সুবিধা পেতে পারে।
তাদের আরও দাবি, যুক্তরাষ্ট্র যদি সৌদিকে এই প্রযুক্তি না দেয়, তাহলে রিয়াদ বিকল্প হিসেবে চীন বা রাশিয়ার কাছ থেকে সহযোগিতা নিতে পারে। এতে মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
তবে বিরোধীরা মনে করছেন, যুক্তরাষ্ট্র যদি কঠোর শর্ত ছাড়া কোনো দেশকে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের অনুমতি দেয়, তাহলে বিশ্বজুড়ে পারমাণবিক অস্ত্র বিস্তার ঠেকানোর প্রচেষ্টা দুর্বল হয়ে পড়তে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, সৌদি আরবের সঙ্গে এই সম্ভাব্য চুক্তি শুধু দুই দেশের সম্পর্কের বিষয় নয়; এটি মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা পরিস্থিতি, ইরান-সৌদি প্রতিদ্বন্দ্বিতা এবং বৈশ্বিক পারমাণবিক নীতিতেও গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে।
এখন সবার নজর যুক্তরাষ্ট্রের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের দিকে। চুক্তিটি কোন শর্তে অনুমোদন পাবে এবং এতে কতটা আন্তর্জাতিক নিয়ন্ত্রণ থাকবে, সেটিই নির্ধারণ করবে এর ভবিষ্যৎ।
Leave a Reply