আন্তর্জাতিক ডেস্ক
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে চলমান পাল্টাপাল্টি হামলা নতুন করে মধ্যপ্রাচ্যে বড় ধরনের সংঘাতের আশঙ্কা তৈরি করেছে। কূটনৈতিক উদ্যোগ ভেস্তে যাওয়া, সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) কার্যত অকার্যকর হয়ে পড়া এবং উপসাগরীয় অঞ্চলে হামলার বিস্তার পরিস্থিতিকে আরও উদ্বেগজনক করে তুলেছে। বিশ্লেষকদের মতে, দ্রুত কার্যকর কূটনৈতিক উদ্যোগ নেওয়া না হলে এই সংঘাত আঞ্চলিক যুদ্ধের রূপ নিতে পারে।
গত ১৭ জুন দুই দেশের মধ্যে যুদ্ধ বন্ধের লক্ষ্যে একটি সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) স্বাক্ষরিত হয়। এতে সব ফ্রন্টে স্থায়ীভাবে সংঘাত বন্ধ, হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক করা, ইরানের ওপর আরোপিত কিছু নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার এবং ৬০ দিনের মধ্যে একটি চূড়ান্ত চুক্তিতে পৌঁছাতে আলোচনা চালিয়ে যাওয়ার বিষয়ে সম্মতি হয়।
এর ধারাবাহিকতায় ২২ জুন সুইজারল্যান্ডে কাতার ও পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় দুই দেশের প্রতিনিধিদের বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। কিন্তু সেই আলোচনা কোনো ইতিবাচক ফল না দিয়েই শেষ হয়। বরং বৈঠকের পরপরই আবারও শুরু হয় পাল্টাপাল্টি হামলা, যা ধীরে ধীরে আরও তীব্র আকার ধারণ করেছে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সম্প্রতি ঘোষণা দেন, ওয়াশিংটন আর সমঝোতা স্মারকের শর্ত মানবে না। শনিবার ইরানও একই ধরনের অবস্থান জানিয়ে অভিযোগ করে, যুক্তরাষ্ট্র বারবার চুক্তির শর্ত লঙ্ঘন করেছে। তাই তেহরানও এমওইউর আওতায় থাকা নিজেদের সব প্রতিশ্রুতি স্থগিত করেছে।
শনিবার যুক্তরাষ্ট্র টানা সপ্তম দিনের মতো ইরানের বিভিন্ন সামরিক ঘাঁটি, নজরদারি ব্যবস্থা, অস্ত্রভান্ডার, নৌঘাঁটি এবং সামরিক রসদ অবকাঠামো লক্ষ্য করে হামলা চালায়। মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) জানায়, এসব হামলার লক্ষ্য ছিল ইরানের সামরিক সক্ষমতা দুর্বল করা।
তবে ইরানের দাবি, যুক্তরাষ্ট্র এখন শুধু সামরিক স্থাপনা নয়, বিমানবন্দর, রেলস্টেশন, সেতু, টেলিযোগাযোগ নেটওয়ার্ক, বিদ্যুৎকেন্দ্র এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ বেসামরিক অবকাঠামোকেও লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করেছে। ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে, সর্বশেষ হামলায় হরমোজগান প্রদেশে অন্তত তিনজন নিহত ও আটজন আহত হয়েছেন। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে দুটি সেতু, একটি সড়ক সুড়ঙ্গ এবং টেলিযোগাযোগ অবকাঠামো। স্থানীয় প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, ১১৬টি টেলিযোগাযোগ টাওয়ার অচল হয়ে পড়েছে।
খুজেস্তান প্রদেশের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, গত ১০ দিনে যুক্তরাষ্ট্র ১২টি শহরের ৯৫টি স্থানে হামলা চালিয়েছে। এতে বিদ্যুৎকেন্দ্র ও পানি শোধনাগারের অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় দক্ষিণাঞ্চলের কয়েকটি এলাকায় সুপেয় পানির সরবরাহ বন্ধ হয়ে গেছে।
ইরানের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, নতুন করে সংঘাত শুরু হওয়ার পর যুক্তরাষ্ট্রের হামলায় অন্তত ৫০ জন নিহত এবং ৫০০ জনের বেশি আহত হয়েছেন।
অন্যদিকে মার্কিন হামলার জবাবে ইরান উপসাগরীয় অঞ্চলে মার্কিন-সংশ্লিষ্ট সামরিক স্থাপনাগুলো লক্ষ্য করে হামলা চালানোর দাবি করেছে। ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি) জানিয়েছে, কুয়েতের একটি তেল স্থাপনা ও বিদ্যুৎকেন্দ্র, বাহরাইনের শেখ ইসা বিমানঘাঁটির জ্বালানি সংরক্ষণাগার এবং জর্ডানের আল-আজরাক সামরিক ঘাঁটির বিভিন্ন স্থাপনা লক্ষ্য করে হামলা চালানো হয়েছে।
রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রায় তিন মাস পর প্রথমবারের মতো সৌদি আরবের আল-খারজ এলাকার প্রিন্স সুলতান বিমানঘাঁটির আশপাশেও সতর্কতা জারি করা হয়েছে। যদিও এ বিষয়ে সৌদি কর্তৃপক্ষ আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো মন্তব্য করেনি।
যুক্তরাষ্ট্র জানিয়েছে, জর্ডানে ইরানের হামলায় দুই মার্কিন সেনা নিহত হয়েছেন। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের তথ্যমতে, চলমান সংঘাতে মার্কিন বাহিনীর হতাহতের সংখ্যাও বেড়েছে।
এর আগে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প হুঁশিয়ারি দিয়েছিলেন, ইরান আলোচনায় না ফিরলে দেশটির বিদ্যুৎকেন্দ্রসহ গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো লক্ষ্য করে আরও হামলা চালানো হবে। সেই ঘোষণার পর থেকেই ইরানের দক্ষিণাঞ্চলে হামলার তীব্রতা বাড়তে থাকে।
পরিস্থিতি নিয়ে কড়া প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন ইরানের সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি। এক লিখিত বিবৃতিতে তিনি অভিযোগ করেন, যুক্তরাষ্ট্র বারবার সমঝোতা স্মারকের শর্ত ভঙ্গ করেছে। তার ভাষায়, এতে প্রমাণ হয়েছে যে মার্কিন প্রশাসনের প্রতিশ্রুতির কোনো মূল্য নেই।
একই সঙ্গে ইরানের জ্যেষ্ঠ সামরিক উপদেষ্টা মেজর জেনারেল মোহসেন রেজায়ি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র যদি আরও দুই থেকে তিন দিন একই ধরনের হামলা চালায়, তাহলে তেহরান আবারও সর্বাত্মক সামরিক অভিযান শুরু করবে।
আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের মতে, সংঘাত এখন আর শুধু ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। কুয়েত, বাহরাইন, জর্ডান এবং সৌদি আরব পর্যন্ত এর প্রভাব পৌঁছে গেছে। ফলে পুরো মধ্যপ্রাচ্য নতুন করে বড় ধরনের নিরাপত্তা সংকটের মুখে পড়তে পারে।
কাতারভিত্তিক আরব পারস্পেকটিভস ইনস্টিটিউটের প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক জেইদন আলকিনানি বলেন, যুদ্ধের বর্তমান গতিপথ অত্যন্ত উদ্বেগজনক। তার মতে, সংঘাত ধীরে ধীরে একটি বৃহত্তর আঞ্চলিক যুদ্ধে রূপ নেওয়ার ঝুঁকি তৈরি করছে। একই সঙ্গে জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর কার্যকর কূটনৈতিক উদ্যোগের অভাব পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।
পরিস্থিতি যেভাবে দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে, তাতে মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা, জ্বালানি সরবরাহ, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য এবং বৈশ্বিক অর্থনীতির ওপর এর প্রভাব আরও গভীর হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকরা।
Leave a Reply