ক্রীড়া ডেস্ক
২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপে আলজেরিয়ার বিপক্ষে ৩-০ গোলের দাপুটে জয় পেয়েছে বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা। ম্যাচজুড়ে লিওনেল মেসির দুর্দান্ত হ্যাটট্রিক ফুটবল বিশ্বকে মুগ্ধ করলেও খেলা শেষে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছে ম্যাচের শুরুতে বাতিল হওয়া একটি গোল। ফুটবল বিশ্লেষক ও সমর্থকদের একাংশের দাবি, মেসির সেই গোলটি বৈধ ছিল এবং ভিএআরের ভুল সিদ্ধান্তের কারণে আর্জেন্টিনা একটি নিশ্চিত গোল থেকে বঞ্চিত হয়েছে।
কানসাস সিটিতে অনুষ্ঠিত গ্রুপ ‘জে’-এর ম্যাচের মাত্র ৪ মিনিটে লাউতারো মার্তিনেজের বাড়ানো পাস থেকে বল পেয়ে দুর্দান্ত ফিনিশিংয়ে আলজেরিয়ার জালে বল জড়ান লিওনেল মেসি। স্টেডিয়ামে উপস্থিত আর্জেন্টিনা সমর্থকেরা উল্লাসে ফেটে পড়লেও মুহূর্তেই লাইন্সম্যানের অফসাইড পতাকা সেই আনন্দে ভাটা ফেলে। পরে ভিএআর (ভিডিও অ্যাসিস্ট্যান্ট রেফারি) পর্যালোচনার পরও সিদ্ধান্ত বহাল থাকে এবং গোলটি বাতিল ঘোষণা করা হয়।
তবে ম্যাচ শেষ হওয়ার পর নতুন করে শুরু হয় বিতর্ক। আন্তর্জাতিক ফুটবল বিশ্লেষণ প্রতিষ্ঠান “আর্কাইভো ভিএআর” তাদের প্রযুক্তিগত বিশ্লেষণে দাবি করেছে, গোলের মুহূর্তে মেসি অফসাইডে ছিলেন না; বরং তিনি সম্পূর্ণ অনসাইড অবস্থানে ছিলেন। সংস্থাটির প্রকাশিত গ্রাফিক্স ও বিশ্লেষণে দেখানো হয়, ভিএআর প্রযুক্তিতে ডিফেন্ডারের অবস্থান নির্ধারণের ক্ষেত্রে সম্ভাব্য ভুল হয়েছে, যার ফলে অফসাইড লাইন সঠিকভাবে আঁকা হয়নি।
প্রতিষ্ঠানটির ভাষ্য অনুযায়ী, “মেসির অবস্থান নির্ধারণের সময় আলজেরিয়ার শেষ ডিফেন্ডারের শরীরের যে অংশটি গণনায় আসার কথা ছিল, সেটি যথাযথভাবে বিবেচনায় নেওয়া হয়নি। সঠিক প্রজেকশন ব্যবহার করা হলে মেসি অনসাইডেই থাকতেন এবং গোলটি বৈধ হিসেবে গণ্য হতো।”
বিষয়টি প্রকাশ্যে আসার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শুরু হয়েছে ব্যাপক আলোচনা। ফুটবল বিশ্লেষক, সাবেক খেলোয়াড় এবং সমর্থকদের মধ্যে অনেকেই ভিএআর প্রযুক্তির নির্ভুলতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তাদের মতে, ফুটবলে প্রযুক্তির ব্যবহার মানবিক ভুল কমানোর জন্য হলেও প্রযুক্তি পরিচালনায় ভুল হলে তা খেলার ফলাফল ও ন্যায়বিচারকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে পারে।
তবে এই বিতর্কের মধ্যেও স্বস্তির বিষয় হলো, ম্যাচের ফলাফলে বাতিল গোলটির কোনো প্রভাব পড়েনি। গোল বাতিলের পরও দমে যাননি মেসি। ১৬ মিনিটে বক্সের বাইরে থেকে দুর্দান্ত শটে প্রথম গোল করেন তিনি। এরপর দ্বিতীয়ার্ধে আরও দুটি গোল করে পূর্ণ করেন নিজের বিশ্বকাপ ক্যারিয়ারের প্রথম হ্যাটট্রিক। তার অসাধারণ নৈপুণ্যে ৩-০ গোলের বড় জয় নিয়ে মাঠ ছাড়ে আর্জেন্টিনা।
এই ম্যাচটি মেসির জন্য ছিল আরও বিশেষ। আর্জেন্টিনার জার্সিতে এটি ছিল তার ২০০তম আন্তর্জাতিক ম্যাচ, আর বিশ্বকাপে ২৭তম ম্যাচ, যা বিশ্বকাপ ইতিহাসে কোনো খেলোয়াড়ের সর্বোচ্চ ম্যাচ খেলার রেকর্ড। এমন এক ঐতিহাসিক রাতে হ্যাটট্রিকের পাশাপাশি বিতর্কিত গোল বাতিলের ঘটনাও যোগ হয়েছে আলোচনার খাতায়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, আধুনিক ফুটবলে ভিএআর প্রযুক্তি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করলেও এর সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া আরও স্বচ্ছ হওয়া প্রয়োজন। অনেকেই মনে করছেন, ভবিষ্যতে এমন বিতর্ক এড়াতে ভিএআরের অডিও, সিদ্ধান্ত গ্রহণের ব্যাখ্যা এবং প্রযুক্তিগত বিশ্লেষণ আরও উন্মুক্ত করা উচিত।
এদিকে, এ বিষয়ে এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া জানায়নি ফিফা বা ম্যাচ পরিচালনাকারী রেফারি দল। তবে ফুটবল অঙ্গনে আলোচনার ঝড় থামেনি। বিশ্বকাপের শুরুতেই মেসির বাতিল গোল নিয়ে যে প্রশ্ন উঠেছে, তা ভিএআর প্রযুক্তির কার্যকারিতা এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের নির্ভুলতা নিয়ে নতুন করে বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। অন্যদিকে, বিতর্ক ছাপিয়ে আর্জেন্টিনা সমর্থকদের বিশ্বাস—যদি সেই গোলটি গণনায় ধরা হতো, তাহলে মেসির নামের পাশে হয়তো লেখা থাকত বিশ্বকাপ ইতিহাসের অন্যতম স্মরণীয় চার গোলের কীর্তি।
Leave a Reply