ক্রীড়া ডেস্ক
বিশ্ব ফুটবলে নতুন এক ইতিহাসের জন্ম দিল বাংলাদেশ। ইউরোপের মাটিতে প্রথমবার কোনো ম্যাচ খেলতে নেমেই জয় তুলে নিয়েছে লাল-সবুজের প্রতিনিধিরা। ফিফা আন্তর্জাতিক প্রীতি ম্যাচে স্বাগতিক সান মারিনোকে ২-১ গোলে হারিয়ে ইউরোপীয় দলের বিপক্ষে নিজেদের প্রথম জয় উদযাপন করেছে জামাল ভূঁইয়ার দল।
এ ম্যাচটি ছিল বাংলাদেশের নতুন মার্কিন কোচ টমাস ডুলির অধীনে প্রথম আন্তর্জাতিক ম্যাচ। দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রথম পরীক্ষাতেই জয় এনে দিয়ে দারুণভাবে যাত্রা শুরু করলেন তিনি। অন্যদিকে বাংলাদেশের ফুটবল ইতিহাসেও যুক্ত হলো এক নতুন মাইলফলক।
সান মারিনো ফিফা র্যাংকিংয়ের তলানিতে অবস্থান করলেও ইউরোপীয় ফুটবলের অংশ হওয়ায় নিয়মিতভাবে ইতালি, জার্মানি, স্পেন, ইংল্যান্ডসহ বিশ্বের শক্তিশালী দলগুলোর বিপক্ষে খেলতে অভ্যস্ত। সেই দলের বিপক্ষে ইউরোপের মাটিতে জয় পাওয়াকে বাংলাদেশের ফুটবল অঙ্গনে বিশেষ অর্জন হিসেবেই দেখা হচ্ছে।
এর আগে ইউরোপের মাটিতে বাংলাদেশের খেলার অভিজ্ঞতা ছিল খুবই সীমিত। ২০০০ সালে ইংল্যান্ডে ভারতের বিপক্ষে খেললেও জয় পাওয়া হয়নি। এছাড়া ২০০১ সালে ভারতে অনুষ্ঠিত এক ম্যাচে বসনিয়ার কাছে ২-০ গোলে পরাজিত হয়েছিল বাংলাদেশ। ফলে ইউরোপীয় কোনো দেশের বিপক্ষে এটি বাংলাদেশের প্রথম জয় হিসেবে ইতিহাসে স্থান করে নিল।
ম্যাচের নায়ক ডিফেন্ডার তপু বর্মণ। দুই অর্ধে দুটি গোলই করেছেন তিনি, আর দুটিই এসেছে হেড থেকে। প্রথমার্ধে দলের হয়ে লিড এনে দেওয়ার পাশাপাশি ম্যাচের শেষদিকে জয়সূচক গোলটিও করেন তিনি। দ্বিতীয়ার্ধে জামাল ভূঁইয়া মাঠ ছাড়ার পর অধিনায়কের আর্মব্যান্ডও ওঠে তপুর হাতে। নেতৃত্ব ও পারফরম্যান্স—দুই দিক থেকেই দিনটি ছিল তার।
ম্যাচের ১৯তম মিনিটে হামজা চৌধুরীর নেওয়া ফ্রি-কিক থেকে শেখ মোরসালিনের নিখুঁত ক্রসে হেড করে গোল করেন তপু। এতে গ্যালারিতে থাকা হাজারো বাংলাদেশি সমর্থকের উল্লাসে মুখর হয়ে ওঠে স্টেডিয়াম। তবে সেই আনন্দ বেশিক্ষণ স্থায়ী হয়নি। ৩৩তম মিনিটে তপুর ভুলে সুযোগ পেয়ে সমতায় ফেরে সান মারিনো। বেরাদির কাটব্যাক থেকে নিকোলাস গোল করে ম্যাচে সমতা ফেরান।
বিরতির পর বাংলাদেশের খেলার গতি বাড়াতে একসঙ্গে কয়েকটি পরিবর্তন আনেন কোচ ডুলি। সামিত সোম, জায়ান আহমেদ ও সোহেল রানা জুনিয়র মাঠে নামার পর আক্রমণে ধার বাড়ে। বিশেষ করে সামিত ও জায়ানের উপস্থিতি মাঝমাঠে নতুন গতি এনে দেয়। বাংলাদেশ একবার গোলবঞ্চিতও হয়, যখন ফয়সাল আহমেদ ফাহিমের জোরালো শট পোস্টে লেগে ফিরে আসে।
ম্যাচের ৮৬তম মিনিটে আসে কাঙ্ক্ষিত মুহূর্ত। হামজা চৌধুরীর ফ্রি-কিক থেকে বিশ্বনাথ ঘোষের নেওয়া ভলি তপু বর্মণের মাথায় লেগে জালে জড়ায়। দ্বিতীয়বারের মতো দলকে এগিয়ে দিয়ে ম্যাচের নায়ক বনে যান এই ডিফেন্ডার।
শেষ দিকে সান মারিনো সমতা ফেরানোর সর্বোচ্চ চেষ্টা চালায়। ইনজুরি সময়ে গোলরক্ষক মিতুল মারমার হাত ফসকে বল গোললাইনের খুব কাছে চলে গেলেও পুরোপুরি লাইন অতিক্রম না করায় বেঁচে যায় বাংলাদেশ। এরপর বাকি সময় নিরাপদে কাটিয়ে ঐতিহাসিক জয় নিশ্চিত করে লাল-সবুজের দল।
ম্যাচটি অনুষ্ঠিত হয় ইতালির ভেতরে অবস্থিত ক্ষুদ্র রাষ্ট্র সান মারিনোতে। ইতালিতে বসবাসরত বিপুল সংখ্যক বাংলাদেশি প্রবাসী রোম, মিলান, ভেনিসসহ বিভিন্ন শহর থেকে ছুটে আসেন জাতীয় দলকে সমর্থন দিতে। ফলে অ্যাওয়ে ম্যাচ হলেও স্টেডিয়ামের পরিবেশ ছিল অনেকটাই বাংলাদেশের হোম ম্যাচের মতো। গ্যালারিজুড়ে ছিল বাংলাদেশের পতাকা, স্লোগান ও সমর্থকদের উচ্ছ্বাস।
এই জয়ের ফলে বাংলাদেশের ফিফা র্যাংকিং পয়েন্ট অর্জনের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক ফুটবলে আত্মবিশ্বাসও অনেকটাই বেড়ে যাবে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। নতুন কোচ, নতুন পরিকল্পনা এবং হামজা চৌধুরী, সামিত সোমদের মতো প্রবাসী ফুটবলারদের অন্তর্ভুক্তিতে বাংলাদেশের ফুটবলে যে নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলছে, সান মারিনোর বিপক্ষে এই জয় যেন তারই প্রথম সফল বার্তা।
ইউরোপের মাটিতে বাংলাদেশের প্রথম ম্যাচ, প্রথম জয় এবং নতুন কোচের অধীনে স্বপ্নের সূচনা—সব মিলিয়ে দিনটি বাংলাদেশের ফুটবল ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে থাকবে বহুদিন।
Leave a Reply