তিস্তা নিউজ ডেস্ক:
ইরানে গত কয়েক মাসের রাজপথের বিক্ষোভ এখন আপাতদৃষ্টিতে স্তিমিত। নিরাপত্তা বাহিনীর কঠোর অভিযান, হাজার হাজার গ্রেপ্তার, এবং বিক্ষোভ সমর্থনের অভিযোগে ব্যবসায়িক সম্পদ বাজেয়াপ্ত করা ও ‘সন্ত্রাসবাদের’ মামলার কারণে জনগণ এখন সরাসরি আন্দোলনে নেই। এই পরিস্থিতিতে মনে হচ্ছে, ইরানের কর্তৃপক্ষ আবারও নিয়ন্ত্রণ ফিরে পেয়েছে।
তবে এই ‘শান্তি’ কেবল পৃষ্ঠতলের। বিশ্লেষকরা বলছেন, জনগণের মধ্যে থাকা ক্ষোভ এখনও বিদ্যমান, যা বিক্ষোভের মূল কারণ ছিল। ইরানের সামনে এখন দুটি পথ খুলে গেছে—এক, কঠিন আপস করে আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার ও অর্থনীতি সংস্কার করা; দুই, আর কোনো পরিবর্তন না আনে বড় ধরনের গণ–অভ্যুত্থানের মুখোমুখি হওয়া।
ইরানের অর্থনীতি ধুঁকছে। আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা, দুর্নীতি এবং অব্যবস্থাপনার কারণে রিয়ালের মান তলানিতে, তেল রপ্তানি কমেছে, এবং মুদ্রাস্ফীতি গত বছর ৪২ শতাংশ ছাড়িয়েছে। বিদ্যুৎ ও পানির সংকট সাধারণ মানুষের জীবনকে আরও দুর্বিষহ করছে। নিষেধাজ্ঞা শিথিল করতে হলে তেহরানকে ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে আলোচনায় বসতে হবে, যা পরমাণু কর্মসূচি, ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র এবং আঞ্চলিক মিত্র নেটওয়ার্কের ক্ষেত্রে আপস করার দাবি আনবে।
নিরাপত্তা নীতিও সংকটে রয়েছে। ইরানের ‘ফরোয়ার্ড ডিফেন্স’ কৌশল দেশকে বাইরে থেকে হামলা থেকে রক্ষা করেছে, কিন্তু সামরিক ও আঞ্চলিক নেটওয়ার্কের ওপর কোনো আপস খামেনি কখনো করেননি। সিরিয়ায় আসাদ সরকারের পতন, লেবাননের হিজবুল্লাহর নেতৃত্ব ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া এবং ইসরায়েলের হামলা ইরানের আঞ্চলিক শক্তিকে দুর্বল করেছে। দেশের নাগরিকরা রাজনৈতিক স্বাধীনতার বিনিময়ে নিরাপত্তা পেয়েছিলেন, কিন্তু সাম্প্রতিক সংঘাত সেই চুক্তিকে নড়বড়ে করেছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক আলীরেজা আজিজি মনে করেন, ইরানের শাসনব্যবস্থা ইতোমধ্যেই রূপান্তরের পথে। ধর্মতাত্ত্বিক নেতৃত্বের হাত থেকে ক্ষমতা ধীরে ধীরে সামরিক নেতৃত্বের কাছে সরে যাচ্ছে, যেখানে রেভোল্যুশনারি গার্ডস (আইআরজিসি) সবচেয়ে শক্তিশালী রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হচ্ছে। আজিজি বলেন, “খামেনির পরবর্তী সময়ে বর্তমান ইসলামি প্রজাতন্ত্র আর দেখা যাবে না। সেটি জনগণের আন্দোলনের মাধ্যমে পরিবর্তিত হবে, নাকি নিরাপত্তা বাহিনীর হাত ধরে নতুন কোনো রূপে আবির্ভূত হবে—সেটাই দেখার বিষয়। তবে পরিবর্তন এখন অনিবার্য।”
অতএব, ইরানের সামনে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে পরিবর্তনের চাপ বেড়ে চলেছে, আর রাজনীতি, অর্থনীতি ও নিরাপত্তা—সব মিলিয়ে দেশটি এক গভীর সন্ধিক্ষণে পৌঁছেছে।
Leave a Reply