তিস্তা নিউজ ডেস্ক
সরকার কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি, কৃষিপণ্যের বহুমুখীকরণ এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় স্মার্ট কৃষি কার্যক্রম বাস্তবায়নের লক্ষ্যে একটি সমন্বিত মহাপরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। এই পরিকল্পনার অংশ হিসেবে ২০২৬ সালের ১৪ এপ্রিল কৃষক কার্ড চালু করা হয়, যার মাধ্যমে কৃষকদের বিভিন্ন সেবা সহজ ও সরাসরি প্রদান করা হবে। পর্যায়ক্রমে দেশের সকল কৃষককে এই কার্ডের আওতায় আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
কৃষক কার্ডের মাধ্যমে কৃষকরা মোট ১০ ধরনের সেবা পাবেন। এর মধ্যে রয়েছে ন্যায্যমূল্যে কৃষি উপকরণ সরবরাহ, সরকারি ভর্তুকি ও প্রণোদনা প্রদান, স্বল্পমূল্যে কৃষিযন্ত্র পাওয়া, সেচ সুবিধা নিশ্চিত করা, সহজ শর্তে কৃষিঋণ, কৃষি বিমা, কৃষিপণ্য ন্যায্যমূল্যে বিক্রির সুযোগ, কৃষি প্রশিক্ষণ, আবহাওয়া ও বাজার তথ্য এবং রোগ-বালাই দমন সংক্রান্ত পরামর্শ প্রদান। ফলে কৃষকদের উৎপাদন ও বাজার ব্যবস্থাপনা আরও সহজ হবে।
কৃষি উৎপাদন ও উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির জন্য উন্নত ও উচ্চ ফলনশীল বীজ ব্যবহার, সুষম সার প্রয়োগ এবং আধুনিক সেচ ব্যবস্থার সম্প্রসারণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ লক্ষ্যে ২০ হাজার কিলোমিটার খাল খননের কর্মসূচি হাতে নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি কৃষি যান্ত্রিকীকরণে ভর্তুকি দিয়ে ট্রাক্টর, হারভেস্টার ও রিপারসহ বিভিন্ন যন্ত্রপাতি সহজলভ্য করা হচ্ছে।
পতিত জমি আবাদে আনা এবং জমির সর্বোত্তম ব্যবহার নিশ্চিত করতে ক্রপ জোনিং পদ্ধতি চালু করা হয়েছে। এর মাধ্যমে অঞ্চলভিত্তিক মাটি ও আবহাওয়ার উপযোগী ফসল নির্ধারণ করা হয়, যা উৎপাদন বৃদ্ধি ও জমির অপচয় কমাতে সহায়ক। সিলেট অঞ্চল ও চরাঞ্চলের পতিত জমি চাষের আওতায় আনতেও বিশেষ প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।
কৃষিপণ্যের বহুমুখীকরণের লক্ষ্যে ধাননির্ভরতা কমিয়ে ফল, সবজি, ডাল, তেলবীজ, মসলা ও ফুল চাষে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। এর ফলে কৃষি খাতে বৈচিত্র্য বৃদ্ধি পাবে এবং কৃষকদের আয় বাড়বে।
কৃষকদের জন্য প্রণোদনা ও সহায়তা কার্যক্রমকে আরও স্বচ্ছ ও কার্যকর করতে কৃষক কার্ডের মাধ্যমে ভর্তুকি প্রদান, স্বল্প সুদের ঋণ এবং ফসল বিমা চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি প্রাকৃতিক দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের পুনর্বাসনের জন্য বিশেষ সহায়তা দেওয়া হচ্ছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে কৃষি পুনর্বাসন খাতে উল্লেখযোগ্য বরাদ্দ থেকে লক্ষাধিক ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষককে বীজ, সার ও অন্যান্য উপকরণ সরবরাহ করা হয়েছে।
কৃষিপণ্য সংরক্ষণ ও বিপণন ব্যবস্থার উন্নয়নে আধুনিক কোল্ড স্টোরেজ ও গুদাম নির্মাণ করা হচ্ছে। এছাড়া ফল ও সবজি সংরক্ষণের জন্য মিনি কোল্ড স্টোরেজ স্থাপন এবং পেঁয়াজ সংরক্ষণের জন্য বিশেষ প্রযুক্তি বিতরণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। উত্তরাঞ্চলে কৃষিপণ্য রপ্তানি অঞ্চল ও ক্রয়কেন্দ্র স্থাপনের পরিকল্পনাও রয়েছে।
কৃষি গবেষণা ও উদ্ভাবনে গুরুত্ব দিয়ে বারি, ব্রি ও বিনার মাধ্যমে অধিক ফলনশীল, রোগ প্রতিরোধী ও স্বল্পমেয়াদি নতুন জাত উদ্ভাবনের কাজ চলছে। বিশেষ করে জলবায়ু সহনশীল ফসল উদ্ভাবনে জোর দেওয়া হচ্ছে, যাতে পরিবর্তিত পরিবেশেও কৃষি উৎপাদন অব্যাহত রাখা যায়।
জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় ক্লাইমেট স্মার্ট কৃষি বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর আওতায় লবণাক্ততা, খরা ও বন্যা সহনশীল ফসল চাষ, উন্নত পানি ব্যবস্থাপনা, কম সেচ ও কম রাসায়নিক ব্যবহার নিশ্চিত করা হচ্ছে। পাশাপাশি AWD পদ্ধতি, প্রি-পেইড সেচ ব্যবস্থা, মোবাইল অ্যাপভিত্তিক কৃষি পরামর্শ এবং প্রিসিশন এগ্রিকালচার প্রযুক্তি ব্যবহার করে পরিবেশবান্ধব ও টেকসই কৃষি ব্যবস্থা গড়ে তোলা হচ্ছে।
Leave a Reply