তিস্তা নিউজ ডেস্ক:
ইরানের নারীরা এখন থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে মোটরসাইকেল চালানোর লাইসেন্স পেতে পারবেন। বুধবার (৪ ফেব্রুয়ারি) স্থানীয় গণমাধ্যমের বরাতে জিওটিভির এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে। এর মাধ্যমে দেশটিতে দুই চাকার যানবাহন চালানো নিয়ে নারীদের জন্য দীর্ঘদিন ধরে চলা আইনি ধূসরতার অবসান ঘটতে যাচ্ছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
আগের আইনে ইরানে নারীদের মোটরসাইকেল বা স্কুটার চালানো স্পষ্টভাবে নিষিদ্ধ ছিল না। তবে বাস্তবতা ছিল ভিন্ন। কর্তৃপক্ষ নিয়মিতভাবে নারীদের মোটরসাইকেল চালানোর লাইসেন্স দিতে অস্বীকৃতি জানাত। ফলে আইনগত কোনো নিষেধাজ্ঞা না থাকলেও নারীরা কার্যত এই যানবাহন চালানোর অধিকার থেকে বঞ্চিত ছিলেন। এই অস্পষ্ট আইনি অবস্থার কারণে দুর্ঘটনা ঘটলে—even যদি নারী চালক ভুক্তভোগী হতেন—তাদেরই আইনগত দায় বহন করতে হতো।
এই পরিস্থিতির পরিবর্তনে ইরানের ভাইস প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ রেজা আরেফ মঙ্গলবার ট্রাফিক কোড স্পষ্ট করার লক্ষ্যে একটি প্রস্তাবে সই করেন। দেশটির সংবাদ সংস্থা ইলনা জানিয়েছে, জানুয়ারির শেষ দিকে ইরানের মন্ত্রিসভা প্রস্তাবটি অনুমোদন দেয়। মূলত সড়ক আইনে বিদ্যমান অস্পষ্টতা দূর করতেই এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
প্রস্তাব অনুযায়ী, ট্রাফিক পুলিশ নারী আবেদনকারীদের জন্য ব্যবহারিক প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করবে। একই সঙ্গে পুলিশের সরাসরি তত্ত্বাবধানে পরীক্ষা গ্রহণ করা হবে এবং যোগ্য প্রার্থীদের মোটরসাইকেল ড্রাইভিং লাইসেন্স ইস্যু করতে হবে। ফলে নারীরা প্রথমবারের মতো আইনি ও প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতির মাধ্যমে মোটরসাইকেল চালানোর সুযোগ পাবেন।
এই সিদ্ধান্ত এমন এক সময়ে নেওয়া হয়েছে, যখন ইরান সাম্প্রতিক বছরগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বড় সামাজিক ও রাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। অর্থনৈতিক অসন্তোষ থেকে শুরু হয়ে দেশজুড়ে সরকারবিরোধী বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে, যা গত মাসে আরও তীব্র আকার ধারণ করে। তেহরান কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, এসব অস্থিরতায় তিন হাজারের বেশি মানুষের মৃত্যু হয়েছে। নিহতদের বেশিরভাগই নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য ও সাধারণ পথচারী বলে দাবি করেছে ইরানের সরকার।
১৯৭৯ সালের ইসলামী বিপ্লবের পর থেকে ইরানে নারীরা নানা সামাজিক বিধিনিষেধের মুখে রয়েছেন। বিশেষ করে মোটরসাইকেল চালানোর ক্ষেত্রে পোশাকবিধি নারীদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে বিবেচিত হয়ে এসেছে। জনসমক্ষে নারীদের মাথা স্কার্ফ দিয়ে ঢেকে রাখা এবং শালীন ও ঢিলেঢালা পোশাক পরা বাধ্যতামূলক।
তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে অনেক নারী এসব বিধিনিষেধ অমান্য করে রাস্তায় নামছেন। এর ফলে মোটরসাইকেল চালানো নারীর সংখ্যা দ্রুত বেড়েছে। ২০২২ সালে নৈতিকতা পুলিশের হেফাজতে পোশাকবিধি লঙ্ঘনের অভিযোগে গ্রেপ্তার হওয়া তরুণী মাহসা আমিনির মৃত্যুর পর এই প্রবণতা আরও জোরালো হয়। ওই মৃত্যুকে কেন্দ্র করে নারীদের নেতৃত্বে ইরানজুড়ে ব্যাপক বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে, যেখানে তারা অধিক স্বাধীনতা ও নাগরিক অধিকার নিশ্চিতের দাবি জানান।
বিশ্লেষকদের মতে, নারীদের মোটরসাইকেল চালানোর লাইসেন্স দেওয়ার সিদ্ধান্ত ইরানের সামাজিক বাস্তবতায় একটি তাৎপর্যপূর্ণ পরিবর্তনের ইঙ্গিত বহন করে এবং এটি ভবিষ্যতে নারীদের অধিকারের ক্ষেত্রে আরও সংস্কারের পথ খুলে দিতে পারে।
Leave a Reply