তিস্তা টিভি ডেস্ক
দীর্ঘদিন অলস পড়ে থাকা রাষ্ট্রীয় শিল্পসম্পদকে আবারও উৎপাদনমুখী করার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। বন্ধ পাটকলগুলোতে বেসরকারি বিনিয়োগের মাধ্যমে নতুন করে শিল্প কার্যক্রম চালু, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বাড়ানোর লক্ষ্যেই এ উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে বলে জানিয়েছেন বাণিজ্য, শিল্প এবং বস্ত্র ও পাটমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির।
বৃহস্পতিবার (৯ জুলাই) সচিবালয়ে বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়ের সম্মেলন কক্ষে বাংলাদেশ জুট মিলস লিমিটেডের নরসিংদী ইউনিটের অতিরিক্ত ১৪ দশমিক ৮০ একর জমি জুট অ্যালায়েন্স লিমিটেডের কাছে লিজ দেওয়ার চুক্তি স্বাক্ষর শেষে আয়োজিত সংবাদ ব্রিফিংয়ে তিনি এসব কথা বলেন।
মন্ত্রী বলেন, কোনো রাষ্ট্রীয় সম্পদ দীর্ঘ সময় ব্যবহারহীন অবস্থায় পড়ে থাকলে তা দেশের জন্য সম্পদ না হয়ে বোঝায় পরিণত হয়। তাই বন্ধ শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোকে আধুনিক প্রযুক্তি, নতুন বিনিয়োগ ও দক্ষ ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে পুনরায় সচল করে উৎপাদন ও কর্মসংস্থানের আওতায় আনা সরকারের অন্যতম লক্ষ্য।
তিনি জানান, জুট অ্যালায়েন্স লিমিটেডের নতুন বিনিয়োগের মাধ্যমে প্রায় ১ হাজার ৫০ কোটি টাকা বিনিয়োগ হবে। এ প্রকল্প চালু হলে বছরে প্রায় ৩ হাজার কোটি টাকার পণ্য উৎপাদনের সম্ভাবনা রয়েছে। পাশাপাশি সরাসরি প্রায় ৩ হাজার মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে।
এই প্রকল্পের আওতায় সয়াবিন বীজ প্রক্রিয়াজাত করে ভোজ্যতেল উৎপাদনের পরিকল্পনা রয়েছে। মন্ত্রীর মতে, এটি শুধু শিল্প খাতেই নয়, দেশের খাদ্য নিরাপত্তা ও আমদানি নির্ভরতা কমাতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির বলেন, সরকার নিজে ব্যবসা পরিচালনার পরিবর্তে বেসরকারি খাতের দক্ষতা ও সক্ষমতাকে কাজে লাগাতে চায়। এজন্য দীর্ঘমেয়াদি লিজ, রাজস্ব ভাগাভাগি এবং সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বের (পিপিপি) বিভিন্ন মডেলে বন্ধ শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো পুনরুজ্জীবনের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
তিনি জানান, উৎপাদন বন্ধ থাকা ২৫টি পাটকলের মধ্যে ২০টি মিলকে লিজ দেওয়ার জন্য নির্বাচন করা হয়েছে। এর মধ্যে ১৪টি মিলের লিজ চুক্তি ইতোমধ্যে সম্পন্ন হয়েছে এবং ৯টি মিলে উৎপাদন শুরু হয়েছে। এসব কারখানায় প্রায় ৯ হাজার ৫০০ মানুষের কর্মসংস্থান হয়েছে। বর্তমানে প্রতিদিন প্রায় ১৬০ মেট্রিক টন পাটজাত পণ্য উৎপাদন হচ্ছে।
নরসিংদীর বাংলাদেশ জুট মিলস লিমিটেডের উদাহরণ তুলে ধরে মন্ত্রী বলেন, প্রতিষ্ঠানটির মোট ৭৭ দশমিক ০২ একর জমির মধ্যে আগে ৩৪ দশমিক ৫০ একর জমি জুট অ্যালায়েন্স লিমিটেডকে লিজ দেওয়া হয়েছিল। সেখানে বর্তমানে প্রতিদিন প্রায় ৪০ মেট্রিক টন পাটজাত পণ্য উৎপাদিত হচ্ছে এবং প্রায় ৩ হাজার ২০০ মানুষের কর্মসংস্থান হয়েছে। নতুন জমি যুক্ত হওয়ায় প্রতিষ্ঠানটির উৎপাদন সক্ষমতা ও বিনিয়োগ আরও বাড়বে।
রপ্তানি খাত নিয়ে মন্ত্রী বলেন, বৈশ্বিক যুদ্ধ পরিস্থিতি, ইউরোপের বাজারে চাহিদা কমে যাওয়া এবং নতুন শুল্কনীতির কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে ভোক্তা ব্যয় কিছুটা কমেছে। তবে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাত এখন উচ্চমূল্যের ম্যান-মেড ফাইবার ও মূল্য সংযোজনকারী পণ্যের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। এই রূপান্তর সম্পন্ন হলে একই পরিমাণ পণ্য রপ্তানি করেও বেশি বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন সম্ভব হবে।
বস্ত্র ও পাট প্রতিমন্ত্রী মো. শরীফুল আলম বলেন, বন্ধ শিল্পকারখানা চালু করা সরকারের অন্যতম অঙ্গীকার। পর্যায়ক্রমে বাংলাদেশ জুট মিলস করপোরেশন (বিজেএমসি), বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস করপোরেশন (বিটিএমসি) এবং অন্যান্য বন্ধ শিল্পপ্রতিষ্ঠানেও বেসরকারি বিনিয়োগের মাধ্যমে উৎপাদন কার্যক্রম চালুর পরিকল্পনা রয়েছে।
জুট অ্যালায়েন্স লিমিটেডের পক্ষ থেকে জানানো হয়, গত দুই বছরে প্রতিষ্ঠানটি বন্ধ পাটকল চালুর উদ্যোগের অংশ হিসেবে প্রায় ৩ হাজার মানুষের কর্মসংস্থান করেছে। কারখানার দৈনিক উৎপাদন সক্ষমতা ৩৫ টন থেকে বাড়িয়ে ৫০ টনে উন্নীত করা হয়েছে এবং উৎপাদিত পণ্য শতভাগ রপ্তানি করা হচ্ছে।
প্রতিষ্ঠানটি আরও জানিয়েছে, পরবর্তী ধাপে প্রায় ১ হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগে দৈনিক ৩ হাজার টন সক্ষমতার একটি সিড ক্রাশিং প্রকল্প চালু করা হবে। আন্তর্জাতিক অর্থায়ন সংস্থা আইএফসির সহযোগিতায় বাস্তবায়িত এই প্রকল্পে সয়াবিন তেল ও সয়া মিল উৎপাদন করা হবে। এর মাধ্যমে দেশের খাদ্য নিরাপত্তা জোরদারের পাশাপাশি আরও প্রায় ৩ হাজার মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হবে।
অনুষ্ঠানে মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গণি, বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়ের সচিব শরফ উদ্দিন আহমেদ চৌধুরীসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
Leave a Reply