আন্তর্জাতিক ডেস্ক
ইউক্রেনের ধারাবাহিক ড্রোন হামলায় তেল শোধনাগার ও জ্বালানি অবকাঠামোর ক্ষয়ক্ষতির পর দেশে তৈরি হওয়া পেট্রোল সংকট মোকাবিলায় ভারত থেকে সমুদ্রপথে পেট্রোল আমদানি শুরু করেছে রাশিয়া। শিল্পসংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রের বরাতে বুধবার (১ জুলাই) এ তথ্য জানিয়েছে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম।
সূত্রগুলোর তথ্য অনুযায়ী, ভারত থেকে ইতোমধ্যে অন্তত ৬০ হাজার মেট্রিক টন পেট্রোল রাশিয়ার উদ্দেশে পাঠানো হয়েছে। এছাড়া ৩০ থেকে ৪০ হাজার মেট্রিক টন ধারণক্ষমতার আরও দুটি ট্যাংকার বর্তমানে রাশিয়ার পথে রয়েছে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত ভারতসহ কয়েকটি দেশ থেকে প্রতি মাসে প্রায় চার লাখ মেট্রিক টন পেট্রোল আমদানির পরিকল্পনা করেছে মস্কো।
ইউক্রেন যুদ্ধের মধ্যে ড্রোন হামলায় রাশিয়ার একাধিক তেল শোধনাগার আংশিকভাবে অচল হয়ে পড়েছে। এর প্রভাব পড়েছে দেশের জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থায়। বিভিন্ন অঞ্চলে পেট্রোল রেশনিং, ফিলিং স্টেশনগুলোতে দীর্ঘ সারি এবং জ্বালানির দামে রেকর্ড বৃদ্ধি দেখা দিয়েছে।
গত সপ্তাহে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন স্বীকার করেন, ড্রোন হামলার কারণে কয়েকটি শোধনাগার ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় কিছু অঞ্চলে জ্বালানির ঘাটতি তৈরি হয়েছে। তবে সরকার পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিচ্ছে বলেও তিনি জানান।
এর আগে ক্রেমলিন জানিয়েছিল, অভ্যন্তরীণ বাজারে স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে গ্রহণযোগ্য মূল্যে জ্বালানি আমদানির বিষয়ে বিভিন্ন দেশের সঙ্গে আলোচনা চলছে। সেই উদ্যোগের অংশ হিসেবেই ভারত থেকে পেট্রোল আমদানির সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বর্তমানে গ্রীষ্মকালীন সময়ে রাশিয়ায় প্রতিদিন প্রায় ১ লাখ ১০ হাজার মেট্রিক টন পেট্রোলের চাহিদা রয়েছে। তবে ভারতের কোন তেল শোধনাগার থেকে এই পেট্রোল সরবরাহ করা হচ্ছে, সে বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো তথ্য প্রকাশ করা হয়নি।
রাশিয়ার ঘনিষ্ঠ মিত্র বেলারুশও দেশটিতে জ্বালানি সরবরাহ বাড়িয়েছে। জুন মাসের প্রথমার্ধে রেলপথে বেলারুশ থেকে রাশিয়ায় পেট্রোল রপ্তানি আগের মাসের একই সময়ের তুলনায় প্রায় তিন গুণ বেড়ে ৭০ হাজার মেট্রিক টনের বেশি হয়েছে।
জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করতে সম্প্রতি রাশিয়ার পার্লামেন্ট কর আইনে সংশোধনী অনুমোদন দিয়েছে। নতুন ব্যবস্থায় আমদানিকৃত জ্বালানিতে ভর্তুকি দেওয়ার সুযোগ রাখা হয়েছে, যাতে বিদেশ থেকে পেট্রোল আমদানি তুলনামূলক কম ব্যয়ে সম্ভব হয় এবং অভ্যন্তরীণ বাজারে মূল্য নিয়ন্ত্রণে রাখা যায়।
অন্যদিকে, ভারত-রাশিয়ার জ্বালানি বাণিজ্য আরও গভীর হয়েছে। আন্তর্জাতিক বাজার বিশ্লেষণ প্রতিষ্ঠান এলএসইজি (LSEG) ও ক্লেপারের তথ্য অনুযায়ী, জুন মাসে ভারতের মোট অপরিশোধিত তেল আমদানির অর্ধেকেরও বেশি এসেছে রাশিয়া থেকে। মে মাসে এ হার ছিল প্রায় ৩৬ দশমিক ৫ শতাংশ। বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম অপরিশোধিত তেল আমদানিকারক দেশ ভারত জুনে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ২৭ লাখ ব্যারেল রুশ তেল আমদানি করেছে। সেই অপরিশোধিত তেলের একটি অংশ দেশটির শোধনাগারে পরিশোধনের পর এখন রাশিয়াতেই পেট্রোল হিসেবে ফিরে যাচ্ছে, যা বৈশ্বিক জ্বালানি বাণিজ্যে একটি ব্যতিক্রমী চিত্র তৈরি করেছে।
এদিকে জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় সহায়তার অংশ হিসেবে কাজাখস্তানও জুলাই ও আগস্ট মাসে রাশিয়াকে ৫০ হাজার মেট্রিক টন পেট্রোল সরবরাহে সম্মত হয়েছে বলে শিল্পসংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র জানিয়েছে। দেশটির পাভলোদার ও কনডেনসাত শোধনাগার থেকে এআই-৯২ ও এআই-৯৫ গ্রেডের পেট্রোল পাঠানোর প্রস্তুতি চলছে।
তবে কাজাখস্তানের জ্বালানি মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, মানবিক সহায়তা হিসেবে জ্বালানি সরবরাহের বিষয়ে রাশিয়ার পক্ষ থেকে এখনো আনুষ্ঠানিক সরকারি অনুরোধ পাওয়া যায়নি। একই সঙ্গে তারা জানিয়েছে, অভ্যন্তরীণ বাজারে পর্যাপ্ত মজুত নিশ্চিত করা গেলে রাশিয়ায় পেট্রোল রপ্তানির সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে না।
Leave a Reply