তিস্তা টিভি ডেস্ক
ঢাকা জেলা প্রশাসনে ইতিহাস: প্রথম নারী ডিসি ফরিদা খানমের নেতৃত্বে নতুন অধ্যায় ব্রিটিশ আমলে ১৭৭২ সালে ওয়ারেন হেস্টিংসের হাত ধরে উপমহাদেশে জেলা প্রশাসন ব্যবস্থার সূচনা হয়। সেই ধারাবাহিকতায় একই বছর ঢাকায়ও জেলা প্রশাসনিক কাঠামোর যাত্রা শুরু হয়। সময়ের পরিবর্তনে ‘ডিস্ট্রিক্ট কালেক্টর’ থেকে বর্তমান ‘জেলা প্রশাসক’ পদে এসেছে বড় ধরনের রূপান্তর, যার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আধুনিক প্রশাসনিক দায়িত্ব ও সেবা কাঠামো।
দীর্ঘ ২৫৪ বছরের এই প্রশাসনিক ইতিহাসে এবারই প্রথম ঢাকা জেলা পেয়েছে একজন নারী জেলা প্রশাসক। বিসিএস ২৫তম ব্যাচের কর্মকর্তা ফরিদা খানম দায়িত্ব গ্রহণের মাধ্যমে ঢাকা জেলা প্রশাসনের ইতিহাসে নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেছেন।
ঢাকা জেলা দেশের সবচেয়ে জটিল ও জনবহুল প্রশাসনিক অঞ্চলের একটি উল্লেখ করে ফরিদা খানম বলেন, প্রায় দুই কোটির বেশি মানুষের সেবা নিশ্চিত করা, দ্রুত নগরায়ণ, ভূমি ব্যবস্থাপনার জটিলতা, অবকাঠামোগত চাপ এবং নানামুখী নাগরিক সমস্যা একসঙ্গে মোকাবিলা করতে হয়। তিনি মনে করেন, এ ধরনের এলাকায় কার্যকর প্রশাসন চালাতে প্রয়োজন প্রযুক্তিনির্ভরতা, পরিকল্পনা এবং মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি।
তিনি বলেন, জনগণের আস্থা অর্জনই একজন প্রশাসকের সবচেয়ে বড় সাফল্য। স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা, মানবিকতা এবং দলগত কাজের মাধ্যমে সেবা নিশ্চিত করতে হবে। জেলা প্রশাসনের কার্যক্রমে নতুন কর্মপদ্ধতি চালু করা হয়েছে এবং রিপোর্টিং ও মনিটরিং ব্যবস্থা আরও শক্তিশালী করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
প্রশাসনে নারীর ভূমিকা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, প্রশাসনসহ বিভিন্ন খাতে নারীরা এখন দক্ষতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করছেন। তার এই দায়িত্ব গ্রহণ অনেক তরুণীর জন্য অনুপ্রেরণা হতে পারে। একজনের সাফল্য অন্যদের সাহস বাড়ায় এবং ভবিষ্যতে প্রশাসনে নারীর অংশগ্রহণ আরও বাড়বে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই তিনি মাঠপর্যায়ের সেবা কার্যক্রমে গতি আনার ওপর জোর দিচ্ছেন। বিশেষ করে মানবিক সহায়তা কার্যক্রম, বয়স্ক, নারী ও শিশুদের দ্রুত সেবা নিশ্চিত করা এবং নাগরিক অভিযোগ নিষ্পত্তিতে সময় কমানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
ঢাকা জেলার অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ ভূমি প্রশাসন। নামজারি, জমি দখল, মামলা, সেবায় দীর্ঘসূত্রতা এবং জটিল প্রক্রিয়া দীর্ঘদিন ধরে নাগরিক ভোগান্তির কারণ হয়ে আছে। এই খাতে সংস্কারকে অগ্রাধিকার দিয়ে নতুন কর্মপরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
এর মধ্যে রয়েছে ই-নামজারি দ্রুত নিষ্পত্তি, ভূমি উন্নয়ন কর অনলাইনে গ্রহণ, মিসকেস কমানো, নিয়মিত মাঠপর্যায়ের তদারকি এবং ভূমি অপরাধ প্রতিরোধ আইনের কার্যকর প্রয়োগ। পাশাপাশি সরকারি খাসজমি উদ্ধার ও সংরক্ষণ কার্যক্রম জোরদার করা হয়েছে।
তিনি বলেন, সরকারি জমি রক্ষা করা রাষ্ট্রীয় স্বার্থ রক্ষার অংশ। সদিচ্ছা, আইনের প্রয়োগ এবং নিয়মিত মনিটরিং থাকলে অবৈধ দখল রোধ করা সম্ভব। এ লক্ষ্যে ঢাকার সরকারি জমির একটি পূর্ণাঙ্গ ডিজিটাল ডাটাবেজ তৈরির কাজ চলছে, যা ভবিষ্যতে ভূমি ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা আনবে।
ডিজিটাল সেবা সম্প্রসারণেও বিশেষ অগ্রগতি হয়েছে। জেলা প্রশাসনের ৩০টির বেশি সেবা এখন ‘মাইগভ’ প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে দেওয়া হচ্ছে। ধাপে ধাপে অন্যান্য সেবাও অনলাইনে আনার পরিকল্পনা রয়েছে, যাতে নাগরিকদের সরাসরি অফিসে এসে ভোগান্তি না পোহাতে হয়।
তিনি বলেন, মানুষের সময় ও সম্মান দুটোই গুরুত্বপূর্ণ। তাই সেবা হতে হবে দ্রুত, সহজ এবং হয়রানিমুক্ত।
ঢাকা জেলা প্রশাসনের কার্যক্রমকে আরও মানবিক ও নাগরিকবান্ধব করতে তিনি সমন্বিত উদ্যোগের ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন। তার মতে, ঢাকা জেলার প্রশাসনিক সফলতা কেবল রাজধানীর জন্য নয়, পুরো দেশের শাসন ব্যবস্থার মানদণ্ড হিসেবেও কাজ করে।
শেষে তিনি বলেন, ঢাকা জেলার সফলতা মানেই বাংলাদেশের প্রশাসনিক অগ্রগতির প্রতিফলন।
Leave a Reply