তিস্তা টিভি ডেস্ক
দেশের ঐতিহ্যবাহী পাট খাতকে আধুনিক প্রযুক্তি, গবেষণা ও বহুমুখী পণ্যের মাধ্যমে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যেতে সরকার ব্যাপক পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে বলে জানিয়েছেন বস্ত্র ও পাটমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির। তিনি বলেছেন, সঠিক পরিকল্পনা ও কার্যকর উদ্যোগ বাস্তবায়ন করা গেলে বর্তমান প্রায় ১ বিলিয়ন ডলারের পাট রপ্তানি আয়কে ভবিষ্যতে ৫ থেকে ৭ বিলিয়ন ডলারের শক্তিশালী শিল্পে রূপান্তর করা সম্ভব।
মঙ্গলবার (১৯ মে) রাজধানীর ফার্মগেটে অবস্থিত জুট ডাইভারসিফিকেশন প্রোমোশন সেন্টার-এ আয়োজিত পাঁচ দিনব্যাপী ‘বহুমুখী পাটপণ্য মেলা-২০২৬’-এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
মন্ত্রী বলেন, একসময় বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রধান চালিকাশক্তি ছিল পাট। স্বাধীনতার পর ১৯৭২-৭৩ অর্থবছরে দেশের মোট রপ্তানি আয়ের প্রায় ৯০ শতাংশই এসেছিল পাট ও পাটজাত পণ্য থেকে। সে সময় ৩৪৮ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের মোট রপ্তানি আয়ের মধ্যে পাট খাতের অবদান ছিল প্রায় ৩১৩ মিলিয়ন ডলার। কিন্তু সময়ের পরিবর্তনে অন্যান্য শিল্পখাত এগিয়ে গেলেও পাটের সম্ভাবনা পুরোপুরি কাজে লাগানো সম্ভব হয়নি। বর্তমানে দেশের মোট রপ্তানি আয় ৫০ থেকে ৫৫ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছালেও পাট খাতের অবদান প্রায় ১ বিলিয়ন ডলারের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রয়েছে।
তিনি বলেন, বিশ্বজুড়ে পরিবেশবান্ধব ও টেকসই পণ্যের চাহিদা বাড়ছে। প্লাস্টিকের বিকল্প হিসেবে পাটজাত পণ্যের আন্তর্জাতিক বাজারও দিন দিন সম্প্রসারিত হচ্ছে। এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে বাংলাদেশ আবারও বিশ্ববাজারে ‘সোনালি আঁশ’-এর নেতৃত্ব ফিরে পেতে পারে। এজন্য সরকার পাটখাতকে আধুনিক ও রপ্তানিমুখী শিল্পে রূপ দিতে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করছে।
খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির আরও বলেন, উন্নতমানের পাটবীজ উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণ হওয়া এখন সরকারের অন্যতম অগ্রাধিকার। বর্তমানে দেশে বছরে প্রায় ৬ হাজার টন পাটবীজের চাহিদা থাকলেও এর বড় অংশ আমদানি করতে হয়। দেশীয়ভাবে উচ্চফলনশীল ও মানসম্মত বীজ উৎপাদনের মাধ্যমে কৃষকদের উৎপাদন ব্যয় কমানো এবং ফলন বৃদ্ধি করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
তিনি জানান, কৃষকদের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে পাটপণ্যের বহুমুখীকরণ, আধুনিক নকশা উদ্ভাবন এবং উচ্চমূল্যের আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এজন্য গবেষণা, প্রযুক্তি উন্নয়ন এবং উদ্ভাবনী পণ্যের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
মন্ত্রী আরও জানান, পাট ও চামড়া খাতে নতুন প্রযুক্তি ও উদ্ভাবনী সক্ষমতা বাড়াতে চীনের শীর্ষস্থানীয় কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে যৌথ গবেষণা ও কারিগরি সহযোগিতার পরিকল্পনা রয়েছে। এর মাধ্যমে আন্তর্জাতিক বাজার উপযোগী ডিজাইন, উন্নত উৎপাদন ব্যবস্থা এবং নতুন পণ্য উদ্ভাবনে সহায়তা পাওয়া যাবে।
তিনি বলেন, রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকলগুলোকে আধুনিকায়নের লক্ষ্যে দ্রুত বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় পরিচালনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এতে উৎপাদনশীলতা বাড়বে, কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে এবং পাটশিল্পকে লাভজনক খাতে পরিণত করা সম্ভব হবে।
অনুষ্ঠানে উপস্থিত বক্তারা বলেন, পাট শুধু একটি কৃষিপণ্য নয়, এটি বাংলাদেশের ইতিহাস, ঐতিহ্য ও অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ। গ্রামীণ অর্থনীতি শক্তিশালী করা, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনে পাট শিল্প আবারও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
অনুষ্ঠান শেষে মন্ত্রী ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা মেলার বিভিন্ন স্টল ঘুরে দেখেন এবং উদ্যোক্তাদের সঙ্গে মতবিনিময় করেন। এসময় তারা পাটপণ্যের আন্তর্জাতিক বাজার সম্প্রসারণ, রপ্তানি প্রতিবন্ধকতা দূর করা এবং নতুন উদ্যোক্তা তৈরির বিষয়েও আলোচনা করেন।
পাঁচ দিনব্যাপী এই বহুমুখী পাটপণ্য মেলা আগামী ২৩ মে পর্যন্ত প্রতিদিন সকাল ১০টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত সবার জন্য উন্মুক্ত থাকবে। মেলায় পাটের তৈরি ব্যাগ, হোম ডেকোর পণ্য, ফ্যাশন সামগ্রী, পরিবেশবান্ধব প্যাকেজিং পণ্যসহ বিভিন্ন উদ্ভাবনী পাটজাত দ্রব্য প্রদর্শন করা হচ্ছে।
Leave a Reply