আন্তর্জাতিক ডেস্ক
দীর্ঘদিনের অচলাবস্থা কাটিয়ে নতুন করে কূটনৈতিক আলোচনায় ফিরছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান। দুই দেশের পরবর্তী কৌশলগত (টেকনিক্যাল) বৈঠক পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদে অনুষ্ঠিত হওয়ার সম্ভাবনাই সবচেয়ে বেশি বলে জানিয়েছে পাকিস্তানের সংবাদমাধ্যম দ্য ডন। কূটনৈতিক সূত্রের বরাত দিয়ে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আগামী ১১ জুলাই বৈঠকটি আয়োজনের প্রস্তুতি চলছে। যদিও বৈঠকের স্থান এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করা হয়নি।
সূত্রগুলোর তথ্য অনুযায়ী, বৈঠকের সম্ভাব্য দুটি ভেন্যু বিবেচনায় রয়েছে—পাকিস্তানের ইসলামাবাদ এবং সুইজারল্যান্ডের বুর্গেনস্টক রিসোর্ট। তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে ইসলামাবাদকেই সবচেয়ে সম্ভাব্য স্থান হিসেবে দেখা হচ্ছে। পাকিস্তান ও কাতার যৌথভাবে মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করায় ইসলামাবাদকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে।
আসন্ন বৈঠকে দুই দেশের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে অমীমাংসিত বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হবে। এর মধ্যে রয়েছে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির ভবিষ্যৎ, যুক্তরাষ্ট্রের আরোপিত অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা ধাপে ধাপে শিথিল করার সম্ভাবনা, বিদেশে জব্দ হয়ে থাকা ইরানের কয়েক বিলিয়ন ডলারের সম্পদ ফেরত দেওয়া, আঞ্চলিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি এবং মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা কমানোর উপায়।
এ ছাড়া বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি রুট হরমুজ প্রণালিতে নিরাপদ ও বাধাহীন নৌ চলাচল নিশ্চিত করা এবং লেবাননে বিদ্যমান যুদ্ধবিরতি টিকিয়ে রাখার বিষয়ও আলোচনার গুরুত্বপূর্ণ এজেন্ডায় থাকবে।
দুই সপ্তাহ আগে স্বাক্ষরিত ‘ইসলামাবাদ সমঝোতা স্মারক’-এর আওতায় আগামী ৬০ দিনের মধ্যে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি ও সংশ্লিষ্ট বিরোধপূর্ণ বিষয়গুলোতে একটি বিস্তৃত সমঝোতায় পৌঁছানোর লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। ১১ জুলাইয়ের বৈঠককে সেই প্রক্রিয়ার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্ট কূটনীতিকরা।
তবে সাম্প্রতিক সময়ে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির রাষ্ট্রীয় জানাজা ও শেষ বিদায়ের আনুষ্ঠানিকতার কারণে কয়েক দিনের জন্য আলোচনা স্থগিত রাখা হয়েছিল। ইরানি কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, আনুষ্ঠানিকতা শেষ হওয়ার পর তেহরানের প্রতিনিধিদলের চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশ করা হবে।
এর আগে চলতি সপ্তাহে কাতারের রাজধানী দোহায় দুই দেশের মধ্যে পরোক্ষ আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। সেই বৈঠক সম্পর্কে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইতিবাচক মন্তব্য করে একে ‘খুব ভালো’ বলে অভিহিত করেন। অন্যদিকে ইরান দাবি করে, বিদেশে আটকে থাকা তাদের সম্পদের একটি অংশ মুক্ত করার বিষয়ে নীতিগত সমঝোতা হয়েছে। তবে ওয়াশিংটন এমন কোনো সমঝোতার বিষয়টি স্বীকার করেনি।
কূটনৈতিক সূত্র জানিয়েছে, আলোচনা সাময়িকভাবে স্থগিত থাকলেও কাতার ও পাকিস্তান উভয় পক্ষের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ বজায় রেখেছে। মধ্যস্থতাকারী দেশ দুটি হরমুজ প্রণালিতে নৌ চলাচলের স্বাধীনতা, আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা এবং পূর্ববর্তী সমঝোতাগুলোর বাস্তবায়ন নিয়ে ধারাবাহিকভাবে কাজ করছে।
এর আগে সুইজারল্যান্ডের বুর্গেনস্টক রিসোর্টে অনুষ্ঠিত উচ্চপর্যায়ের আলোচনায় পারমাণবিক কর্মসূচি, নিষেধাজ্ঞা শিথিল, সামুদ্রিক নিরাপত্তা এবং মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে একটি প্রাথমিক রূপরেখা তৈরি হয়েছিল। বর্তমান বৈঠকে সেই আলোচনার ধারাবাহিকতা বজায় রেখে আরও বাস্তবসম্মত অগ্রগতি অর্জনের চেষ্টা করা হবে।
তবে সংশ্লিষ্ট কূটনীতিকরা সতর্ক করে বলেছেন, কয়েক দফা আলোচনায় কিছু ইতিবাচক অগ্রগতি হলেও ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে গভীর অবিশ্বাস এবং দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক উত্তেজনার কারণে পুরো প্রক্রিয়া এখনও অত্যন্ত স্পর্শকাতর অবস্থায় রয়েছে।
সবকিছু পরিকল্পনা অনুযায়ী এগোলে টেকনিক্যাল পর্যায়ের আলোচনা শেষ হওয়ার পর জুলাইয়ের তৃতীয় সপ্তাহে কাতারের রাজধানী দোহায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে উচ্চপর্যায়ের সরাসরি রাজনৈতিক বৈঠক অনুষ্ঠিত হতে পারে। সেই বৈঠকেই পারমাণবিক ইস্যুসহ দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের ভবিষ্যৎ নিয়ে আরও গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত আসতে পারে বলে আশা করছেন কূটনৈতিক বিশ্লেষকরা।
Leave a Reply