তিস্তা টিভি ডেস্ক
প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পর প্রথম বিদেশ সফরে মালয়েশিয়া ও চীন যাচ্ছেন তারেক রহমান। ছয় দিনের এই সফরে তিনি প্রথমে মালয়েশিয়া এবং পরে চীন সফর করবেন। কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক দিক থেকে সফরটিকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। সরকারের প্রত্যাশা, এ সফরের মাধ্যমে বাংলাদেশের জন্য নতুন সুযোগ ও সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচিত হবে।
মালয়েশিয়া সফরে প্রধানমন্ত্রীর অন্যতম প্রধান লক্ষ্য থাকবে দীর্ঘদিন বন্ধ থাকা বাংলাদেশি শ্রমবাজার পুনরায় চালুর বিষয়টি। একই সঙ্গে বাণিজ্য সম্প্রসারণ, বিনিয়োগ বৃদ্ধি, জ্বালানি সহযোগিতা, কৃষি, শিক্ষা, সেমিকন্ডাক্টর শিল্প, হালাল অর্থনীতি এবং জনযোগাযোগ খাতে দুই দেশের সহযোগিতা আরও জোরদারের বিষয়ে আলোচনা হবে। মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিমের সঙ্গে তারেক রহমানের দ্বিপাক্ষিক বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে, যেখানে দুই দেশের পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিষয় উঠে আসবে। সফরকালে সাংস্কৃতিক বিনিময় ও মুক্ত বাণিজ্য সম্পর্কিত দুটি সমঝোতা স্মারক এবং দুটি নোট অব এক্সচেঞ্জ স্বাক্ষরের সম্ভাবনা রয়েছে। এছাড়া আসিয়ানে বাংলাদেশের অন্তর্ভুক্তি, রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে মালয়েশিয়ার সমর্থন এবং নতুন বাংলাদেশি কর্মী নিয়োগের বিষয়েও আলোচনা হবে।
রাজনৈতিক অঙ্গনে ধারণা ছিল দায়িত্ব গ্রহণের পর প্রধানমন্ত্রী প্রথমে ভারত সফর করবেন। তবে এবার তিনি মালয়েশিয়া ও চীনকে বেছে নিয়েছেন। সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, বিদেশ সফরের সিদ্ধান্ত জাতীয় স্বার্থ, অর্থনৈতিক প্রয়োজন এবং দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের গুরুত্ব বিবেচনায় নেওয়া হচ্ছে। প্রয়োজন হলে ভবিষ্যতে ভারত সফর করা হবে।
মালয়েশিয়া সফর শেষে ২২ জুন সন্ধ্যায় চীনের দালিয়ান শহরে পৌঁছাবেন প্রধানমন্ত্রী। ২৩ থেকে ২৬ জুন পর্যন্ত তিনি চীনে অবস্থান করবেন। সফরের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আলোচ্য বিষয় হবে তিস্তা মহাপরিকল্পনা। বাংলাদেশের পক্ষ থেকে তিস্তা নদী এবং সমন্বিত পানি ব্যবস্থাপনা নিয়ে আলোচনা করা হবে। পররাষ্ট্রসচিব আসাদ আলম সিয়াম জানিয়েছেন, তিস্তার পাশাপাশি অন্যান্য নদী ব্যবস্থাপনা এবং আঞ্চলিক পানি সম্পদ ব্যবহারের বিষয়ও আলোচনায় আসতে পারে। যমুনা-ব্রহ্মপুত্র অববাহিকায় চীনের বিভিন্ন প্রকল্পের প্রেক্ষাপটে এই আলোচনা বিশেষ গুরুত্ব বহন করছে। যদিও প্রকল্পটির ভূরাজনৈতিক সংবেদনশীলতা এবং ভারতের আপত্তির কারণে সরাসরি অর্থায়নের পরিবর্তে সম্ভাব্যতা যাচাই ও ভবিষ্যৎ সহযোগিতার বিষয়টি বেশি গুরুত্ব পেতে পারে।
চীন সফরে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে দেশটির প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং ও প্রধানমন্ত্রী লি কিয়াংয়ের বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে। এসব বৈঠকে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক, বাণিজ্য, বিনিয়োগ, অবকাঠামো উন্নয়ন, সামরিক সহযোগিতা এবং চীনের বিভিন্ন বৈশ্বিক উদ্যোগে বাংলাদেশের সম্ভাব্য সম্পৃক্ততা নিয়ে আলোচনা হবে। একই সঙ্গে ভবিষ্যতে দুই দেশের কৌশলগত সম্পর্ক আরও গভীর করার বিষয়ও গুরুত্ব পাবে।
চীন সফরকালে বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে ১৫ থেকে ১৭টি সমঝোতা স্মারক, চুক্তি ও সহযোগিতা কাঠামো স্বাক্ষরের সম্ভাবনা রয়েছে। এর মধ্যে ১৩টি সমঝোতা স্মারক, দুটি চুক্তি, একটি কর্মপরিকল্পনা এবং একটি প্রটোকল অন্তর্ভুক্ত থাকতে পারে। বাংলাদেশ ইতোমধ্যে নেওয়া চীনা ঋণের সুদের হার কমানো, ঋণ পরিশোধের সময়সীমা বৃদ্ধি এবং গ্রেস পিরিয়ড সম্প্রসারণের অনুরোধও জানাতে পারে।
দালিয়ানে অনুষ্ঠিত বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের সামার দাভোস সম্মেলনেও অংশ নেবেন প্রধানমন্ত্রী। সেখানে তিনি ‘ক্লাইমেট লিডারশিপ ইন শিফটিং গ্লোবাল ল্যান্ডস্কেপ’ শীর্ষক অধিবেশনে প্রধান বক্তা হিসেবে বক্তব্য দেবেন। পাশাপাশি সম্মেলনের বিভিন্ন কর্মসূচিতে অংশগ্রহণ করবেন এবং কাজাখস্তান, মঙ্গোলিয়া, দক্ষিণ কোরিয়াসহ বিভিন্ন দেশের সরকারপ্রধানদের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক বৈঠক করবেন। পরবর্তীতে বেইজিংয়ে বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের আয়োজিত ‘বাংলাদেশ ইনভেস্টমেন্ট ফোরাম’-এ অংশ নিয়ে চীনা বিনিয়োগকারীদের সামনে বাংলাদেশের বিনিয়োগ সম্ভাবনা তুলে ধরবেন এবং দেশে বিনিয়োগের আহ্বান জানাবেন।
পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির জানিয়েছেন, বাংলাদেশ এখন সম্পূর্ণভাবে জাতীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিয়ে বিদেশ সফর ও পররাষ্ট্রনীতি পরিচালনা করছে। কোন দেশে কখন সফর করা হবে, তা নির্ধারিত হচ্ছে বাংলাদেশের প্রয়োজন, কৌশলগত স্বার্থ এবং দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের ভিত্তিতে। সরকার একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণ করছে, যেখানে বৈশ্বিক অংশীদারদের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তোলা হচ্ছে বাস্তব প্রয়োজনের আলোকে।
আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকদের মতে, দক্ষিণ এশিয়ার পরিবর্তিত ভূরাজনৈতিক বাস্তবতায় এই সফর অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। এমন এক সময়ে সফরটি অনুষ্ঠিত হচ্ছে, যখন এ অঞ্চলে প্রভাব বিস্তারের প্রতিযোগিতা আরও তীব্র হয়ে উঠেছে। ভারত চায় বাংলাদেশ যেন চীনের দিকে অতিরিক্ত ঝুঁকে না পড়ে, বিশেষ করে তিস্তা ইস্যুতে। অন্যদিকে বাংলাদেশ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, অবকাঠামো উন্নয়ন, নতুন বিনিয়োগ এবং বহুমুখী কূটনৈতিক অংশীদারত্বের সুযোগ খুঁজছে। সেই বিবেচনায় মালয়েশিয়া ও চীন সফর শুধু দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক জোরদারই নয়, বরং বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ কৌশলগত অবস্থান নির্ধারণের ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
Leave a Reply