তিস্তা টিভি ডেস্ক
ফারাক্কা বাঁধের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব বাংলাদেশের পরিবেশ, কৃষি ও জনজীবনের ওপর ভয়াবহ সংকট তৈরি করেছে বলে মন্তব্য করেছেন পানিসম্পদ মন্ত্রী শহীদ উদ্দিন চৌধুরী এ্যানি। তার ভাষ্য অনুযায়ী, দেশের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ অঞ্চল—অর্থাৎ ২৪ থেকে ২৬টি জেলা—আজ পানির সংকট ও মরুকরণের ঝুঁকিতে রয়েছে, যার প্রভাব পড়ছে প্রায় ৭ কোটি মানুষের জীবনে।
শনিবার (২৩ মে) রাজধানীর জাতীয় প্রেস ক্লাবের তোফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া হলে ‘জাতীয় নদী দিবস’ উপলক্ষে নোঙর ট্রাস্ট আয়োজিত আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
পানিসম্পদ মন্ত্রী বলেন, ফারাক্কা বাঁধের কারণে দেশের বহু নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ কমে গেছে। এর ফলে উত্তর ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের বিস্তীর্ণ এলাকায় কৃষি, মৎস্যসম্পদ ও পরিবেশ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। নদী শুকিয়ে যাওয়ার কারণে অনেক এলাকা ধীরে ধীরে মরুকরণের দিকে এগোচ্ছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
তিনি জানান, এই সংকট মোকাবিলায় সরকার পদ্মা ব্যারেজ প্রকল্প বাস্তবায়নে গুরুত্ব দিচ্ছে। পাশাপাশি তিস্তা মহাপরিকল্পনার কাজও দ্রুত এগিয়ে নেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। মন্ত্রী বলেন, “তিস্তা পাড়ের মানুষের জীবনমান উন্নয়ন এবং নদীকেন্দ্রিক অর্থনীতি পুনরুদ্ধার আমাদের অগ্রাধিকার।”
তিস্তা প্রকল্প প্রসঙ্গে তিনি বলেন, মন্ত্রণালয়ে দায়িত্ব নেওয়ার পর গত তিন মাসে তিনি দেখতে পেয়েছেন যে, দীর্ঘদিন ধরে আলোচিত এ প্রকল্পের অনেক কাজ এখনো অসম্পূর্ণ রয়ে গেছে। তাই নতুন করে সমন্বিত পরিকল্পনা নিয়ে এগোতে হচ্ছে। এ লক্ষ্যে আইডব্লিউএম, সিইজিআইএস ও ওয়ারপোসহ সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো মাঠপর্যায়ে তথ্য সংগ্রহ ও জরিপ চালাচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের মতামতের ভিত্তিতে প্রকল্প বাস্তবায়নের রূপরেখা চূড়ান্ত করা হবে বলে জানান তিনি।
পদ্মা ব্যারেজ প্রকল্প নিয়েও আশাবাদ ব্যক্ত করেন মন্ত্রী। তিনি বলেন, ২০০২ সালে এ প্রকল্পের প্রাথমিক সমীক্ষা শুরু হলেও পরে তা স্থবির হয়ে পড়ে। বর্তমান সরকার আবারও প্রকল্পটি বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিয়েছে এবং দেশি-বিদেশি বিশেষজ্ঞদের মতামত নিয়ে কারিগরি বিশ্লেষণ চলছে।
ভারতের সঙ্গে পানিবণ্টন ও গঙ্গা চুক্তি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, দুই দেশের যৌথ নদী কমিশন নিয়মিতভাবে পানির প্রবাহ পর্যবেক্ষণ করছে। উজান ও ভাটিতে পানির ভারসাম্য নিশ্চিত করতে কারিগরি পর্যায়ে আলোচনা অব্যাহত রয়েছে। সম্প্রতি বাংলাদেশের একটি বিশেষজ্ঞ দল কলকাতায় গিয়ে ফারাক্কা ব্যারেজ এলাকা পরিদর্শন ও দ্বিপাক্ষিক বৈঠক করেছে বলেও জানান তিনি।
আলোচনা সভায় দেশের সাম্প্রতিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়েও কথা বলেন পানিসম্পদ মন্ত্রী। শিশু রামিসা হত্যাকাণ্ডের প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, ঘটনার ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই অভিযুক্তকে গ্রেফতার করা হয়েছে এবং সরকার নিহতের পরিবারের পাশে দাঁড়িয়েছে। তবে একটি পক্ষ ইচ্ছাকৃতভাবে পরিস্থিতিকে অস্থিতিশীল করার চেষ্টা করছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।
বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর সমালোচনা করে মন্ত্রী বলেন, দীর্ঘ সময়ের রাজনৈতিক সংকট কাটিয়ে দেশ পুনর্গঠনের কাজ চলছে। এ সময় সরকারকে সহযোগিতা না করে বিভ্রান্তিকর বক্তব্য ও অপপ্রচার চালানো দেশের জন্য ইতিবাচক নয়।
তিনি আরও বলেন, গণতান্ত্রিক পরিবেশ বজায় রাখতে রাজনৈতিক শালীনতা ও সংলাপের সংস্কৃতি জরুরি। রাস্তা অবরোধ বা বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি না করে আলোচনার মাধ্যমে সমস্যার সমাধানে এগিয়ে আসার আহ্বান জানান তিনি। একই সঙ্গে দেশের নদী রক্ষা ও টেকসই পানি ব্যবস্থাপনায় সরকারকে সহযোগিতা করতে সাংবাদিক ও সচেতন নাগরিকদের প্রতি আহ্বান জানান পানিসম্পদ মন্ত্রী।
Leave a Reply