ক্রীড়া ডেস্ক
ফিফা বিশ্বকাপ শুধু ফুটবলের সবচেয়ে বড় আসরই নয়, এটি বিশ্বের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ ক্রীড়া প্রতিযোগিতাগুলোর একটি। চার বছর পরপর অনুষ্ঠিত এই টুর্নামেন্টে অংশ নেওয়া প্রতিটি দলের স্বপ্ন থাকে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হয়ে সোনালি ট্রফিটি উঁচিয়ে ধরার। ২০২৬ বিশ্বকাপেরও পর্দা নামতে যাচ্ছে শিরোপা নির্ধারণী মহারণের মধ্য দিয়ে। ৪৮ দলের দীর্ঘ লড়াই শেষে ফাইনালে মুখোমুখি হয়েছে আর্জেন্টিনা ও স্পেন। তবে ফাইনালের আগে ফুটবলপ্রেমীদের মনে আবারও ঘুরে ফিরে আসছে একটি পুরোনো প্রশ্ন—বিশ্বকাপ জয়ের পর চ্যাম্পিয়ন দল কি আসল ট্রফিটি নিজেদের কাছে রাখতে পারে?
এর উত্তর হলো—না।
ফাইনাল শেষে বিজয়ী দল মাঠে যে ট্রফি হাতে নিয়ে উদযাপন করে, সেটিই আসল ফিফা বিশ্বকাপ ট্রফি। তবে উদযাপন ও আনুষ্ঠানিকতা শেষ হওয়ার পর ট্রফিটি ফিফার কাছে ফিরিয়ে দিতে হয়। পরে চ্যাম্পিয়ন দলকে দেওয়া হয় আসল ট্রফির হুবহু আদলে তৈরি সোনার প্রলেপযুক্ত ব্রোঞ্জ-অ্যালয়ের একটি প্রতিরূপ (রেপ্লিকা) ট্রফি। এই ট্রফিতেই বিজয়ী দেশের নাম খোদাই করা থাকে এবং সেটিই স্থায়ীভাবে নিজেদের কাছে রাখতে পারে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন দল।
আসল বিশ্বকাপ ট্রফি ফিফার সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদগুলোর একটি। ১৮ ক্যারেট সোনা দিয়ে তৈরি এই ট্রফির উচ্চতা ৩৬.৮ সেন্টিমিটার এবং ওজন প্রায় ৬.২ কেজি। শুধু সোনার মূল্য বিবেচনায় নয়, ইতিহাস ও ঐতিহ্যের কারণেও এটি অমূল্য। এ কারণেই ট্রফিটি স্থায়ীভাবে কোনো দেশের কাছে দেওয়া হয় না। বিশ্বকাপ শেষ হলে এটি সুইজারল্যান্ডের জুরিখে অবস্থিত ফিফা মিউজিয়ামে সংরক্ষণ করা হয়। কেবল বিশ্বকাপ, ট্রফি ট্যুর কিংবা বিশেষ আন্তর্জাতিক অনুষ্ঠানে সীমিত সময়ের জন্য জনসমক্ষে আনা হয় এই ট্রফি।
বিশ্বকাপ ট্রফির ইতিহাসও বেশ রোমাঞ্চকর। বর্তমান ট্রফির আগে ১৯৩০ থেকে ১৯৭০ সাল পর্যন্ত ব্যবহৃত হতো ‘জুল রিমে ট্রফি’। ফরাসি ভাস্কর আবেল লাফ্লুরের নকশায় তৈরি ওই ট্রফিতে প্রাচীন গ্রিক বিজয়ের দেবী নাইকির অবয়ব ফুটিয়ে তোলা হয়েছিল। এটি ছিল ৩৫ সেন্টিমিটার উঁচু এবং সোনার প্রলেপযুক্ত রুপা দিয়ে নির্মিত।
তৎকালীন নিয়ম অনুযায়ী, কোনো দেশ তিনবার বিশ্বকাপ জিতলে ট্রফিটির স্থায়ী মালিক হওয়ার অধিকার পেত। ১৯৭০ সালে তৃতীয়বারের মতো বিশ্বকাপ জিতে ব্রাজিল সেই গৌরব অর্জন করে এবং জুল রিমে ট্রফির স্থায়ী মালিক হয়। এরপরই নতুন ট্রফি তৈরির উদ্যোগ নেয় ফিফা।
জুল রিমে ট্রফিকে ঘিরে রয়েছে বিশ্বকাপ ইতিহাসের সবচেয়ে আলোচিত দুটি ঘটনা। ১৯৬৬ সালে ইংল্যান্ডে বিশ্বকাপের আগে একটি প্রদর্শনী থেকে ট্রফিটি চুরি হয়ে যায়। কয়েক দিন পর দক্ষিণ লন্ডনের একটি ঝোপের নিচে ‘পিকলস’ নামের একটি কুকুর সেটি খুঁজে পায়। এই ঘটনাটি এখনও বিশ্বকাপ ইতিহাসের অন্যতম স্মরণীয় অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত হয়।
তবে দ্বিতীয়বার ভাগ্য আর সহায় হয়নি। ১৯৮৩ সালে ব্রাজিল ফুটবল কনফেডারেশনের সদর দপ্তর থেকে জুল রিমে ট্রফি আবারও চুরি হয়। সেটি আর কখনও উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। ধারণা করা হয়, চোরেরা ট্রফিটি গলিয়ে ফেলেছিল।
জুল রিমে ট্রফির বিদায়ের পর ইতালীয় ভাস্কর সিলভিও গাজ্জানিগা বর্তমান বিশ্বকাপ ট্রফির নকশা করেন। ১৯৭৪ সাল থেকে ব্যবহৃত এই ট্রফিটি ইতালির জিডিই বার্টোনি প্রতিষ্ঠান তৈরি করে আসছে। ট্রফির নকশায় দেখা যায়, দুই মানব অবয়ব পৃথিবীকে মাথার ওপর তুলে ধরে আছে, যা বিশ্ব ঐক্য, বিজয় এবং ফুটবলের বৈশ্বিক আবেদনকে প্রতীকীভাবে তুলে ধরে।
বর্তমান ট্রফি যুগে জার্মানি, আর্জেন্টিনা, ইতালি, ব্রাজিল, ফ্রান্স এবং স্পেন বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হয়েছে। প্রতিবারই বিজয়ী দল মাঠে আসল ট্রফি হাতে উদযাপন করলেও পরে সেটি ফিফার কাছে ফিরিয়ে দিয়েছে এবং স্মারক হিসেবে পেয়েছে প্রতিরূপ ট্রফি।
অনেকের অজানা আরেকটি তথ্য হলো, আসল বিশ্বকাপ ট্রফি সবাই স্পর্শ করতে পারেন না। ফিফার নিয়ম অনুযায়ী কেবল বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়ন দলের খেলোয়াড় ও কোচ, রাষ্ট্রপ্রধান, ফিফা সভাপতি এবং নির্দিষ্ট কয়েকজন কর্মকর্তা এই ট্রফি হাতে নেওয়ার অনুমতি পান। সাধারণ দর্শক বা অন্য কেউ ট্রফিটি স্পর্শ করার সুযোগ পান না।
এবারের বিশ্বকাপ ফাইনালে আর্জেন্টিনা ও স্পেনের মধ্যে যে দলই শিরোপা জিতুক না কেন, তারাও প্রথমে আসল বিশ্বকাপ ট্রফি হাতে নিয়েই বিশ্বজয়ের উল্লাস করবে। তবে সেই উদযাপন শেষ হওয়ার পর ফুটবল বিশ্বের সবচেয়ে কাঙ্ক্ষিত এই সোনালি ট্রফিটি আবার ফিরে যাবে সুইজারল্যান্ডের জুরিখে ফিফা মিউজিয়ামে। আর নতুন বিশ্বচ্যাম্পিয়ন দলের হাতে স্মারক হিসেবে তুলে দেওয়া হবে আসল ট্রফির নিখুঁত প্রতিরূপ, যা তাদের গৌরবময় অর্জনের স্থায়ী স্মারক হয়ে থাকবে।
Leave a Reply