তিস্তা টিভি ডেস্ক
বাংলাদেশের বৈদেশিক নীতির মূল ভিত্তি ভূ-রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা নয়, বরং অর্থনৈতিক স্বার্থ—এমন মন্তব্য করেছেন তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন। তিনি বলেন, আমদানি-রপ্তানি, বৈদেশিক বিনিয়োগ, রেমিট্যান্স, জনশক্তি রপ্তানি এবং আঞ্চলিক অর্থনৈতিক সংযোগকে কেন্দ্র করেই বাংলাদেশের কূটনৈতিক সম্পর্ক পরিচালিত হচ্ছে। এই প্রেক্ষাপটে চীনকে দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত ও অর্থনৈতিক অংশীদার হিসেবে উল্লেখ করেন তিনি।
শনিবার (১৮ জুলাই) রাজধানীর একটি অভিজাত হোটেলে বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সমিতি (বিসিএফএ) আয়োজিত ‘লং লিভ বাংলাদেশ-চায়না ফ্রেন্ডশিপ’ শীর্ষক সেমিনারে বিশেষ অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন বিএনপির মহাসচিব ও স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন এবং সমবায়মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। সভাপতিত্ব করেন বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সমিতির সভাপতি ও বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা অ্যাডভোকেট নজমুল হক নান্নু। এছাড়া বাংলাদেশে নিযুক্ত চীনের রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েন, বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন প্রতিমন্ত্রী এম রশিদুজ্জামান মিল্লাতসহ রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক অঙ্গনের বিভিন্ন ব্যক্তিত্ব অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন।
বক্তব্যে জহির উদ্দিন স্বপন বলেন, বর্তমান বিশ্বে রাজনৈতিক সম্পর্কের চেয়ে অর্থনৈতিক সম্পর্কই রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে সহযোগিতার প্রধান চালিকাশক্তি হয়ে উঠেছে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও একই বাস্তবতা প্রযোজ্য। তিনি বলেন, দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ধরে রাখতে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, বিনিয়োগ, প্রযুক্তি এবং উন্নয়ন সহযোগিতাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক প্রসঙ্গে তিনি জানান, দুই দেশের দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের পরিমাণ বর্তমানে প্রায় ২০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। তবে এ বাণিজ্যে আমদানির পরিমাণ অনেক বেশি, যেখানে বাংলাদেশ থেকে চীনে রপ্তানি এখনো এক বিলিয়ন ডলারের নিচে। এই বাণিজ্য ঘাটতি কমাতে চীনের বাজারে বাংলাদেশি পণ্যের প্রবেশাধিকার আরও বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
তথ্যমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশে প্রত্যক্ষ বৈদেশিক বিনিয়োগের (এফডিআই) অন্যতম বড় উৎস এখন চীন। অবকাঠামো উন্নয়ন, শিল্পায়ন, বিদ্যুৎ, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, তথ্যপ্রযুক্তি এবং যোগাযোগ খাতে চীনের বিনিয়োগ ও প্রযুক্তিগত সহযোগিতা বাংলাদেশের অর্থনীতিকে আরও গতিশীল করতে পারে।
তিনি আরও বলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে সরকার আঞ্চলিক সংযোগ বৃদ্ধিকে বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে। সেই লক্ষ্যেই বাংলাদেশ, চীন ও মিয়ানমারের মধ্যে সড়ক যোগাযোগ স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এই করিডর বাস্তবায়িত হলে আঞ্চলিক বাণিজ্য, পর্যটন এবং বিনিয়োগে নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচিত হবে। এ ধরনের উদ্যোগে ভারতসহ আগ্রহী অন্যান্য দেশও অংশ নিতে পারবে বলে তিনি মন্তব্য করেন।
রোহিঙ্গা সংকটের প্রসঙ্গ টেনে তথ্যমন্ত্রী বলেন, এটি শুধু বাংলাদেশের নয়, পুরো অঞ্চলের জন্য একটি মানবিক ও নিরাপত্তাজনিত চ্যালেঞ্জ। তিনি আশা প্রকাশ করেন, মিয়ানমারের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে রোহিঙ্গাদের নিরাপদ, স্বেচ্ছাসেবী ও টেকসই প্রত্যাবাসনে চীন আরও কার্যকর ভূমিকা পালন করবে।
বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি সম্পর্কে তিনি বলেন, দেশের কূটনৈতিক অবস্থান সম্পূর্ণভাবে জাতীয় অর্থনৈতিক স্বার্থকে কেন্দ্র করে পরিচালিত হয়। বাংলাদেশ চীন ও ভারত থেকে পণ্য আমদানি করে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপে রপ্তানি বৃদ্ধি করে এবং মধ্যপ্রাচ্য ও অন্যান্য দেশে কর্মরত প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্স দেশের অর্থনীতিকে শক্তিশালী করে। তাই বৈদেশিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে ভারসাম্যপূর্ণ ও বাস্তবভিত্তিক নীতিই অনুসরণ করা হচ্ছে।
চীনের রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েনের ভূমিকাও প্রশংসা করেন তথ্যমন্ত্রী। তিনি বলেন, বাংলাদেশ-চীন সম্পর্ককে আরও কার্যকর, গতিশীল এবং বহুমাত্রিক পর্যায়ে নিয়ে যেতে রাষ্ট্রদূতের সক্রিয় উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে। আগামী দিনে বাণিজ্য, বিনিয়োগ, প্রযুক্তি, যোগাযোগ ও উন্নয়ন সহযোগিতার মাধ্যমে দুই দেশের সম্পর্ক আরও গভীর হবে বলেও তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
Leave a Reply