নিজস্ব প্রতিনিধি,
বিএনপি চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী *খালেদা জিয়া*র হৃদ্যন্ত্র ও ফুসফুসে সংক্রমণ ধরা পড়ায় তাকে ঢাকার এভারকেয়ার হাসপাতালে নিবিড় পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে। চিকিৎসকেরা জানিয়েছেন, ৭৯ বছর বয়সী এই সাবেক প্রধানমন্ত্রী গত কয়েক মাস ধরে নিয়মিতই অসুস্থ হয়ে পড়ছেন। রোববার রাতে হঠাৎ করেই তার একাধিক শারীরিক জটিলতা দেখা দিলে দ্রুত হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।
খালেদা জিয়ার চিকিৎসার জন্য গঠিত মেডিকেল বোর্ডের সদস্য *অধ্যাপক ডা. এফ এম সিদ্দিকী* সাংবাদিকদের বলেন, ‘তিনি (খালেদা জিয়া) কয়েক মাস ধরে বারবার অসুস্থ হচ্ছেন। রোববার একইসঙ্গে তার বেশ কয়েকটি জটিলতা দেখা দেয়। আমরা দেখতে পাই যে তার বুকের ভেতর সংক্রমণ হয়েছে। হার্টের সমস্যা আগে থেকেই ছিল।’
### *হৃদ্রোগের পূর্বের জটিলতা ও নতুন সংক্রমণ*
চিকিৎসকেরা জানান, খালেদা জিয়ার হৃদ্যন্ত্রে আগে থেকেই *পারমানেন্ট পেসমেকার* স্থাপন করা রয়েছে এবং এর আগে *স্টেন্টিং* করা হয়েছিল। তিনি *মাইট্রাল স্টেনোসিস* নামের একটি দীর্ঘস্থায়ী সমস্যায় ভুগছেন, যেখানে হৃদকপাট সংকুচিত হয়ে রক্তপ্রবাহ বাধাগ্রস্ত হয়। এই অবস্থার মধ্যেই নতুনভাবে সংক্রমণ হৃদ্যন্ত্র ও ফুসফুসে ছড়িয়ে পড়ায় পরিস্থিতি জটিল হয়ে ওঠে।
অধ্যাপক সিদ্দিকী বলেন, সংক্রমণ হৃদ্যন্ত্র থেকে ফুসফুসে ছড়িয়ে পড়ায় দ্রুত চিকিৎসা শুরু করা ছাড়া আর কোনো উপায় ছিল না। তিনি জানান, ‘হাসপাতালে আনার পর আমরা তাৎক্ষণিকভাবে সব প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা সম্পন্ন করেছি। প্রাথমিক রিপোর্ট হাতে পাওয়ার পরপরই মেডিকেল বোর্ড একসঙ্গে বসে জরুরি চিকিৎসা পরিকল্পনা ঠিক করে।’
### *জরুরি চিকিৎসা, পরবর্তী ১২ ঘণ্টা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ*
চিকিৎসকেরা জানিয়েছেন, খালেদা জিয়াকে অ্যান্টিবায়োটিকসহ সমস্ত জরুরি চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। কয়েকটি পরীক্ষা-নিরীক্ষার রিপোর্ট এখনও বাকি, যা আগামী ২৪ ঘণ্টার মধ্যে পাওয়া যাবে। তবে চিকিৎসকদের মতে, *পরবর্তী ১২ ঘণ্টা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ*, কারণ এই সময়টিতে ওষুধের প্রতিক্রিয়া এবং সংক্রমণের অগ্রগতি নির্ণায়ক ভূমিকা রাখবে। বর্তমানে তিনি সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণের জন্য একটি বিশেষায়িত কেবিনে রয়েছেন।
রোববার রাত ৮টার দিকে তাকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। তার চিকিৎসার সার্বিক তত্ত্বাবধান করছেন *অধ্যাপক শাহাবুদ্দিন তালুকদার*, যিনি মেডিকেল বোর্ডের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
### *দেশি–বিদেশি বিশেষজ্ঞদের যৌথ পর্যবেক্ষণ*
হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার পরপরই মেডিকেল বোর্ড একটি গুরুত্বপূর্ণ সভা করে। ওই সভায় অধ্যাপক এফ এম সিদ্দিকী, ডা. জাফর ইকবাল, ডা. জিয়াউল হক, ডা. মামুন আহমেদ ও অবসরপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সাইফুল ইসলাম উপস্থিত ছিলেন। পাশাপাশি লন্ডন থেকে *ডা. জুবাইদা রহমান* এবং যুক্তরাষ্ট্রের জনস হপকিন্স হাসপাতালের বেশ কয়েকজন বিশেষজ্ঞ ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে সভায় যোগ দেন।
অধ্যাপক সিদ্দিকী বলেন, ‘সব সদস্যের মতামত নিয়ে সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত অনুযায়ী তার চিকিৎসা শুরু হয়েছে।’
### *পরিবারের সার্বক্ষণিক যোগাযোগ*
অধ্যাপক এ জেড এম জাহিদ হোসেন জানান, বোর্ড অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে চিকিৎসা ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে। তিনি সাংবাদিকদের বলেন, ‘আমরা পরিস্থিতিকে এখনই অত্যন্ত উদ্বেগজনক মনে করছি না। তবে চিকিৎসার ধরনে কোনো পরিবর্তন আনা প্রয়োজন আছে কি না, সেটি রোগীর অবস্থার ওপর নির্ভর করবে। তাই ১২ ঘণ্টা পরে বোর্ড আবার বসবে।’
বিএনপি ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান *তারেক রহমান* এবং তার স্ত্রী *ডা. জুবাইদা রহমান* লন্ডন থেকে ভোর থেকেই নিয়মিত চিকিৎসকদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছেন। খালেদা জিয়ার প্রয়াত পুত্র আরাফাত রহমান কোকোর স্ত্রী *সৈয়দা শামিলা রহমান*ও হাসপাতালে উপস্থিত আছেন। পরিবারের অন্যান্য সদস্যরাও নিয়মিত তার চিকিৎসার খোঁজখবর নিচ্ছেন। খালেদা জিয়া দেশবাসীর কাছে তার সুস্থতার জন্য দোয়া চেয়েছেন।
### *দীর্ঘদিনের শারীরিক জটিলতা*
খালেদা জিয়া আগে থেকেই আর্থ্রাইটিস, ডায়াবেটিস, কিডনি রোগ, ফুসফুসের জটিলতা ও চোখের সমস্যাসহ একাধিক দীর্ঘস্থায়ী রোগে ভুগছেন। উন্নত চিকিৎসার জন্য তিনি চলতি বছরের ৭ জানুয়ারি লন্ডনে যান এবং ১১৭ দিন চিকিৎসা শেষে ৬ মে দেশে ফেরেন।
Leave a Reply