ডেস্ক রিপোর্ট
ত্রিমুখী সংকটে বিপর্যস্ত দেশের শিল্প ও ব্যবসা খাত। ব্যাংকিং খাতের অসহযোগিতা, তীব্র জ্বালানি সংকট এবং প্রশাসনিক জটিলতার কারণে সামগ্রিক ব্যবসা পরিবেশ বর্তমানে অত্যন্ত নাজুক অবস্থায় পৌঁছেছে। এলসি খোলা, আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রম পরিচালনা এবং প্রয়োজনীয় ঋণ সুবিধা পাওয়ার ক্ষেত্রে জটিলতা দিন দিন বাড়ছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে কাস্টমস সংক্রান্ত জটিলতা ও কিছু ক্ষেত্রে স্বেচ্ছাচারিতা, যা বাণিজ্য কার্যক্রমকে আরও বাধাগ্রস্ত করছে। ফলে ইতোমধ্যে অনেক কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে এবং আরও বন্ধ হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
রাজধানীর একটি হোটেলে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এসব উদ্বেগজনক তথ্য তুলে ধরেন সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ী নেতারা। তারা জানান, বর্তমান পরিস্থিতিতে শিল্পখাত টিকে থাকাই বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
জ্বালানি সংকটকে সবচেয়ে বড় প্রতিবন্ধকতা হিসেবে উল্লেখ করা হয়। বাস্তবে শিল্প-কারখানাগুলো প্রয়োজনীয় জ্বালানি পাচ্ছে না। অনেক ক্ষেত্রে ফিলিং স্টেশন থেকে কনটেইনারে তেল সরবরাহ বন্ধ থাকায় উৎপাদন কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। বিদ্যুৎ পরিস্থিতিও উদ্বেগজনক—প্রতিদিন গড়ে কয়েক ঘণ্টা লোডশেডিং হচ্ছে, যা উৎপাদনের ধারাবাহিকতা নষ্ট করছে।
উৎপাদন ব্যাহত হওয়ায় নির্ধারিত সময়ের মধ্যে রপ্তানি করা যাচ্ছে না। এতে এয়ার শিপমেন্ট বা মূল্য ছাড়ের মতো অতিরিক্ত ব্যয় গুনতে হচ্ছে। অন্যদিকে, উৎপাদন বন্ধ থাকলেও শ্রমিকদের মজুরি পরিশোধ করতে হচ্ছে, ফলে ব্যয় আরও বেড়ে যাচ্ছে। জ্বালানি ও পরিবহন খরচ বৃদ্ধিও চাপ বাড়াচ্ছে। সব মিলিয়ে উৎপাদন খরচ অন্তত ২০ শতাংশ বেড়েছে, তবে আন্তর্জাতিক বাজারে পূর্বনির্ধারিত দামের কারণে সেই বাড়তি খরচ সমন্বয় করা সম্ভব হচ্ছে না।
এদিকে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দার প্রভাবেও রপ্তানি খাত চাপে রয়েছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ প্রধান বাজারগুলোতে ভোক্তা ব্যয় কমে যাওয়ায় ক্রয়াদেশ কমছে। ফলে অনেক শিল্পকারখানা বর্তমানে তাদের মোট সক্ষমতার মাত্র ৫০ থেকে ৬০ শতাংশ ব্যবহার করে চলছে।
তৈরি পোশাক খাত, যা দেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি, এই সংকটে সবচেয়ে বেশি প্রভাবিত হচ্ছে। রপ্তানি আয়ের বড় অংশই এই খাত থেকে আসে এবং লাখ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান এর ওপর নির্ভরশীল। তাই এ খাতের স্থিতিশীলতা বজায় রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, বর্তমান পরিস্থিতি মোকাবিলায় শিল্পখাতকে আরও প্রযুক্তিনির্ভর, দক্ষ এবং টেকসই উৎপাদন ব্যবস্থার দিকে এগোতে হবে। একই সঙ্গে বৈশ্বিক ফ্যাশন শিল্প দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে—ফাস্ট ফ্যাশন, রিসাইক্লিং ও সার্কুলার অর্থনীতির সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে না পারলে বাংলাদেশ প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়তে পারে।
এই প্রেক্ষাপটে আন্তর্জাতিক মানের প্রযুক্তি ও উদ্ভাবন তুলে ধরতে ঢাকায় একটি বড় শিল্প প্রদর্শনীর আয়োজন করা হচ্ছে, যেখানে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের প্রতিষ্ঠান অংশ নেবে। উদ্যোক্তাদের আশা, এ ধরনের উদ্যোগ দেশের শিল্পখাতকে ঘুরে দাঁড়াতে সহায়তা করবে এবং আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়াবে।
সব মিলিয়ে, বহুমাত্রিক এই সংকট কাটিয়ে উঠতে সমন্বিত উদ্যোগ, নীতিগত সহায়তা এবং বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ এখন সময়ের দাবি।
Leave a Reply